গল্প, উপন্যাস, সিনেমা, পডকাস্ট কিংবা বিভিন্ন মানুষের বক্তব্যের প্রভাবে আমাদের বিশেষ করে বাঙালিদের মনস্তত্ত্ব আজ এতটাই আচ্ছন্ন যে, কখন এসব মাধ্যম আমাদের সম্পূর্ণ চিন্তাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে, তা আমরা টেরই পাইনি। আমরা আমাদের বাস্তব জীবনকেও যেন একটি সাজানো কাহিনীর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছি। আমাদের অবচেতন মন ধরে নিয়েছে, যেকোনো কাহিনীতে যেমন একজন ‘মহানায়ক’ থাকে, তেমনি তার বিপরীতে একজন ‘ভিলেন’ বা খলনায়কের উপস্থিতিও বাঞ্ছনীয়। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা আমাদের ইতিহাসকেও ঠিক এভাবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কে মহানায়ক আর কে ভিলেন বাঙালির এই তর্কের যেন কোনো শেষ নেই। অথচ, ইতিহাস তো কোনো কল্পকাহিনী নয়; এটি চলে তার নিজস্ব গতিতে। সেখানে সবকিছু কেবল সাদা কিংবা কালো নয়, বরং এমন অনেক ধূসর অধ্যায় থাকে যা প্রচলিত গল্পের ছকে বাঁধা যায় না।
ইতিহাসের একটি অমোঘ সত্য হলো “যেখানে অন্যায় ও অবিচার থাকবে, সেখানে দীর্ঘশ্বাস, ক্ষোভ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিবাদ থাকবেই।” এটি প্রকৃতির নিয়ম, প্রকৃতি কখনো এর বরখেলাপ করে না। ব্রিটিশদের দুইশ বছরের শোষণ ও সম্পদ লুণ্ঠন, দেশভাগের আগে জমিদারি প্রথার মাধ্যমে সাধারণ কৃষকের ওপর নিপীড়ন, কিংবা দেশভাগের পর বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের চরম বৈষম্য ও তাচ্ছিল্য এসবের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়া ও প্রতিবাদ গড়ে ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক।
স্বাধীনতার পরও এই ধারার অবসান হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী মজিবুর রহমানের বাকশাল তৈরি , বাধ্য হয়েই আর যেভাবেই হোক জিয়ার বিমানবাহিনীর অফিসারদের একাধারে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো , এরপর এরশাদের অন্যায় , বেগম জিয়ার ৯৬’র সরকার , ৯৭~২০০০আম্লীগের দুর্নীতি, বিএনপির দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নশিপ , তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কঠোর অন্যায় নীতি , আর পরবর্তী আওয়ামী লীগের ১৪ বছরের স্বৈরাচারের সরকার সবকিছুই ছিল অন্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন স্তর । প্রতিটি ক্ষেত্রেই যখন মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও ক্ষোভ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে, তখনই অনিবার্যভাবে প্রতিবাদ হয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা ইতিহাস নয়, বরং কাহিনী খুঁজতেই বেশি পছন্দ করি। তাই এসব গণপ্রতিবাদে যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আমরা খুব সহজেই তাদের ‘নায়ক’ বানিয়ে ফেলেছি। আমাদের কাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, অনেক নায়ক থাকলে যেহেতু গল্প জমে না, তাই আমরা কৌশলে কাউকে একক ‘মহানায়ক’ বা কাল্ট ফিগারে পরিণত করেছি। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ মাটিতে সেই মহানায়কদের মানবিক ভুলত্রুটিগুলো যখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে, তখন ইতিহাসের পালাবদলে সেই মহানায়কই একসময় খলনায়কে পরিণত হন।
আমরা যদি আরও শত বছর ধরেও কে নায়ক আর কে খলনায়ক এই তর্কে মেতে থাকি, তবে তাতে গুটিকয়েক সুবিধাবাদী মানুষের লাভ হলেও, দিনশেষে বাংলাদেশের কোনো জয় হবে না। যতদিন আমরা ব্যক্তিকে অন্ধভাবে নায়ক বা ভিলেন বানানোর এই চর্চা অব্যাহত রাখব, ততদিন বিভেদের এই তর্ক চলতেই থাকবে। যেদিন আমরা ব্যক্তি নয়, বরং মানুষের ‘কাজ’কে ভালো বা খারাপ হিসেবে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করতে শিখব—সে যে-ই হোক না কেন—সেদিন হয়তো আমাদের রাজনীতিতে আর কোনো ‘কাল্ট ফিগার’ বা মহানায়কের প্রয়োজন হবে না। আর সেদিনই অবসান হবে এই অর্থহীন তর্কের।






























