ভূমিকা: একটি অপ্রত্যাশিত রূপান্তরের সূচনা
বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস এবং প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে নাড়িয়ে দেয়। ইভন রিডলির ইসলাম গ্রহণ ঠিক এমনই এক যুগান্তকারী এবং নাটকীয় পরিবর্তনের আখ্যান, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক দূরত্বের মাঝে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের তুমুল ব্যস্ততার মাঝে একজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাংবাদিক যখন সত্যের অনুসন্ধানে নামেন, তখন তার সেই যাত্রা কেবল একটি ব্যক্তিগত রূপান্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বৈশ্বিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে তালেবানের হাতে বন্দি হওয়ার মধ্য দিয়ে তার এই জীবন-পরিবর্তনকারী যাত্রার সূচনা ঘটে । একজন সাধারণ প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান এবং কট্টর নারীবাদী হিসেবে জীবন শুরু করা ইভন রিডলি কীভাবে পবিত্র কোরআনের আলোকে নিজের আধ্যাত্মিক শূন্যতা পূরণ করলেন, এবং কীভাবে পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার দেয়াল ভেঙে ইসলামের একজন বলিষ্ঠ রক্ষক হয়ে উঠলেন, এই বিস্তৃত গবেষণা প্রতিবেদনে তার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ
- সত্যের সন্ধান ও রূপান্তর: ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি হওয়া ইভন রিডলির জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। মৃত্যুর ভয় থেকে শুরু করে সত্যের আলোর দিকে তার এই যাত্রা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।
- কোরআনের অলৌকিকতা: মুক্তি পাওয়ার পর দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কোরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি অনুধাবন করেন যে, ১৪০০ বছর ধরে কোরআনের একটি বিন্দু বা শব্দও পরিবর্তিত হয়নি, যা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে বিরল।
- নারীর সম্মান ও মর্যাদা: পশ্চিমা সমাজ যে নারী স্বাধীনতার কথা বলে, ইসলাম তা শত শত বছর আগেই নারীদের প্রদান করেছে। কোরআনের সম্পত্তি ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
- হিজাবের প্রশান্তি ও সুরক্ষা: তার কাছে হিজাব কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, বরং এটি অশালীন দৃষ্টি থেকে সুরক্ষার একটি সম্মানজনক মাধ্যম। তিনি একে পশ্চিমা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি ঢাল হিসেবে দেখেন।
- উম্মাহর ঐক্যের শক্তি: মক্কায় হজ্বের ময়দানে লাখ লাখ মানুষের একসাথে সারিবদ্ধ হয়ে শৃঙ্খলার সাথে নামাজ আদায় করার দৃশ্য তাকে মুসলিম উম্মাহর বিশাল শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
- অবিরাম রাজনৈতিক সংগ্রাম: ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কেবল একজন সাংবাদিক হিসেবে থেমে থাকেননি, বরং ফিলিস্তিন, নারী অধিকার, যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামফোবিয়ার বিরুদ্ধে এক আন্তর্জাতিক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

ইভন রিডলির প্রারম্ভিক জীবন এবং সাংবাদিকতা পেশার পটভূমি
ইভন রিডলির জীবনের প্রাথমিক পর্যায়টি ছিল সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের মতোই প্রচলিত ধারায় আবর্তিত। তিনি ২৩ এপ্রিল ১৯৫৮ সালে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ডারহামের স্ট্যানলি নামক এক শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তার বেড়ে ওঠা একটি প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান পরিবারে, যেখানে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ধর্মীয় নিয়মকানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করা হতো। শৈশব থেকেই তিনি স্থানীয় চার্চে গান গাইতে এবং গ্রামের সানডে স্কুলে শিক্ষকতা করতে অত্যন্ত পছন্দ করতেন ।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় পত্রিকা ‘দ্য ডারহাম অ্যাডভার্টাইজার সিরিজ’-এ তার একটি চিঠি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট হন । তিনি প্রথাগত সাংবাদিকতার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন না করেই সরাসরি হাই স্কুল থেকে এই পেশায় প্রবেশ করেন, যা তার স্বভাবজাত প্রতিভা এবং সাহসিকতারই প্রমাণ দেয় । প্রায় তিন দশক ধরে তিনি ব্রিটিশ সাংবাদিকতায় অত্যন্ত প্রতাপের সাথে কাজ করেছেন। তিনি ‘দ্য সানডে টাইমস’, ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট অন সানডে’, ‘দ্য অবজারভার’, ‘ডেইলি মিরর’ এবং ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর মতো ফ্লিট স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোতে কাজ করেছেন । ‘ওয়েলস অন সানডে’-তে তিনি ডেপুটি এডিটর এবং অ্যাক্টিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ‘সানডে এক্সপ্রেস’-এর চিফ রিপোর্টার হিসেবে নিযুক্ত হন । ফ্লিট স্ট্রিটে তার খ্যাতি ছিল এমন এক সাংবাদিকের, যিনি সংবাদের সন্ধানে যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। একসময় তিনি নিজেকে ফ্লিট স্ট্রিটের “প্যাটসি স্টোন” (Patsy Stone) হিসেবে পরিচিত করেছিলেন, যা তার তখনকার উচ্ছৃঙ্খল ও মদ্যপায়ী জীবনধারার ইঙ্গিত দেয় ।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন নারী অধিকার আন্দোলনের একজন অগ্রপথিক। তিনি ‘উইমেন ইন জার্নালিজম’-এর মতো সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং পশ্চিমা নারীবাদী দর্শনে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তবে এই বাহ্যিক জাগতিক সাফল্য এবং বস্তুবাদী দর্শনের আড়ালে তার মনের গভীরে একটি অজানা আধ্যাত্মিক শূন্যতা সর্বদা বিরাজমান ছিল।
২০০১ সালের আফগানিস্তান মিশন এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইভন রিডলির জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে, যা বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসেও একটি কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা যখন আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতন ঘটাতে এবং “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ” (War on Terror) শুরু করার জন্য সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য সানডে এক্সপ্রেস’-এর প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে তাকে পাকিস্তানে পাঠানো হয় । পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে একটি মানবতাবাদী (human interest) প্রতিবেদন তৈরির দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন ।
২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, আমেরিকার বোমা হামলা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে, ইভন রিডলি নীল রঙের বোরকায় নিজেকে আবৃত করে সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে গাধার পিঠে চড়ে পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন । তার এই যাত্রা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানতেন, তালেবান শাসনাধীনে ক্যামেরা বহন করা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পেশাদারিত্বের তাড়নায় তিনি এই ঝুঁকি গ্রহণ করেন।
তালেবানের হাতে বন্দি: ভয়াবহ দিনগুলো এবং মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত
জালালাবাদের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর, সীমান্ত থেকে মাত্র দুই মাইল ভেতরে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তার গাধাটি হঠাৎ চমকে উঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সময় তাকে সামলাতে গিয়ে তার বোরকার নিচ থেকে লুকিয়ে রাখা ক্যামেরাটি মাটিতে পড়ে যায় এবং একজন তালেবান সৈন্যের চোখে ধরা পড়ে । রিডলি তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন; তিনি পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, সেই তরুণ তালেবান সৈন্যের সবুজ চোখ এবং বিশাল দাড়ি দেখে তিনি প্রথমটায় চমকে গিয়েছিলেন, কিন্তু মুহূর্তেই ভয় তাকে গ্রাস করেছিল । যেহেতু তিনি কোনো পাসপোর্ট বহন করছিলেন না, তাই তাকে মার্কিন গুপ্তচর সন্দেহে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কাবুলের অন্ধকার কারাগারে পাঠানো হয় ।
কারাগারের দিনগুলোতে ইভন রিডলির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ছিল চরম বিপর্যস্ত। তিনি প্রতিদিন ভাবতেন যে আজই হয়তো তার জীবনের শেষ দিন। পশ্চিমা মিডিয়ার প্রচারণার কারণে তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাকে গণধর্ষণ করা হবে বা পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হবে । এই ভয় থেকে তার ভেতরে তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিরক্ষামূলক আগ্রাসন জন্ম নেয়। তিনি তার অপহরণকারীদের প্রতি অত্যন্ত রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করেন। তিনি তাদের ওপর থুতু ছুঁড়ে মারেন, গালিগালাজ করেন, এবং খাবার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে টানা অনশন ধর্মঘট (hunger strike) শুরু করেন ।
বন্দিদশায় নিজের অভিজ্ঞতাগুলো ধরে রাখার জন্য তিনি একটি টুথপেস্টের বক্স এবং সাবানের মোড়কের ভেতরে লুকিয়ে একটি গোপন ডায়েরি লিখেছিলেন । সেই ডায়েরিতে তিনি বিস্ময়ের সাথে লিপিবদ্ধ করেন যে, চরম দুর্ব্যবহার এবং উস্কানি দেওয়া সত্ত্বেও, তালেবান যোদ্ধারা তার সাথে কোনো শারীরিক নির্যাতন বা খারাপ আচরণ করেনি। উল্টো তারা তাকে “অতিথি” হিসেবে সম্মান করত এবং বলত যে তিনি কষ্ট পেলে তারাও কষ্ট পায় । পশ্চিমা মিডিয়ার চিত্রায়ণের সাথে বাস্তবের এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য ইভন রিডলির মনে প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মুক্তির প্রতিশ্রুতি এবং দেশে প্রত্যাবর্তন
রিডলির অনশন এবং শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চাপ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ কূটনিতিক এবং মিডিয়া মুঘল রিচার্ড ডেসমন্ডের তৎপরতার পাশাপাশি, তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মুল্লাহ ওমরের মানবিক নির্দেশে তাকে অবশেষে আটকের ১১ দিন পর, ৮ অক্টোবর ২০০১ তারিখে মুক্তি দেওয়া হয় ।
তবে মুক্তির আগে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কাবুলের কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন তালেবান ধর্মীয় নেতা তাকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দেন। ইভন তখন এতটাই ভীত ছিলেন যে তিনি স্পষ্টভাবে কোনো উত্তর দিতে পারছিলেন না, পাছে ভুল উত্তরে তাকে হত্যা করা হয়। তখন তিনি একটি চতুর কিন্তু জীবন রক্ষাকারী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন: যদি তাকে নিরাপদে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তিনি লন্ডনে ফিরে গিয়ে অবশ্যই পবিত্র কুরআন পাঠ করবেন এবং ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করবেন । এই প্রতিশ্রুতিটি ছিল মূলত তার বাঁচার একটি কৌশল, কিন্তু পরবর্তীতে এটিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
লন্ডনে ফিরে আসার পর ইভন রিডলি দেখতে পান যে, তার বন্দিদশার সময়টুকুতে বিশ্ব কতটা বদলে গেছে। তার কন্যা ডেইজির নবম জন্মদিন তিনি মিস করেছেন, যা তাকে সাময়িকভাবে মানসিকভাবে দুর্বল করেছিল । কিন্তু পেশাগতভাবে তিনি তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে শুরু করেন। তবে তিনি যখন পশ্চিমা নারীবাদী এবং সহকর্মীদের কাছে তালেবানদের কাছ থেকে পাওয়া সম্মানের কথা বলতে শুরু করেন, তখন তিনি চরম বৈরিতার সম্মুখীন হন। পশ্চিমা সমাজ, যারা অ্যান্টি-তালেবান প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী ছিল, তারা তার এই সত্যগুলোকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অনেকেই তাকে “স্টকহোম সিনড্রোম” (Stockholm Syndrome) দ্বারা আক্রান্ত বলে কটাক্ষ করে ।
বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান: কোরআনের আলোয় নারী অধিকারের নবমূল্যায়ন
ইভন রিডলি তার প্রতিশ্রুতি ভোলেননি। যদিও তিনি ভেবেছিলেন কোরআন হবে নারী নির্যাতনের নিয়মকানুনে ভরা একটি বই, তবুও তিনি এটিকে একটি “একাডেমিক এক্সারসাইজ” বা গবেষণামূলক কাজ হিসেবে পাঠ করতে শুরু করেন । পশ্চিমা মিডিয়ার কারণে তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইসলাম একটি হিংস্র ধর্ম এবং কোরআন হলো এমন একটি বই যেখানে স্ত্রীকে প্রহার করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে ।
কিন্তু কোরআনের প্রথম কয়েকটি অধ্যায় পড়ার পরই তার এই ভ্রান্ত ধারণা সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। তিনি আবিষ্কার করেন যে, কোরআনের নারী অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ এবং সম্পত্তির আইনগুলো অত্যন্ত আধুনিক, যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত । একজন নারীবাদী হিসেবে তিনি সত্তরের দশকে যে অধিকারগুলোর জন্য রাস্তায় নেমে লড়াই করেছিলেন, তিনি দেখলেন ইসলাম ১৪০০ বছর আগে থেকেই মুসলিম নারীদের সেই অধিকারগুলো প্রদান করে আসছে । তিনি একটি সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছিলেন, “আমি যখন কোরআন পড়লাম, প্রথম যে বিষয়টি আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম তা হলো সম্পত্তি এবং ডিভোর্স আইন। আমি অবাক হয়েছিলাম, মনে হচ্ছিল এটি কোনো হলিউডের ডিভোর্স আইনজীবীর লেখা হতে পারে!” ।
তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানকে আরও এগিয়ে নিতে তিনি সেসময়ের প্রখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদদের শরণাপন্ন হন। তিনি ডক্টর জাকি বাদাওয়ি এবং ‘কমিটি ফর দ্য ডিফেন্স অফ লেজিটিমেট রাইটস’ (CDLR)-এর ডক্টর মুহাম্মদ আল-মাসারির মতো পণ্ডিতদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন । এছাড়া, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের একটি বিতর্কে অংশ নেওয়ার পর তিনি বিতর্কিত ইসলামিক স্কলার শেখ আবু হামজা আল-মাসরির কাছ থেকেও কিছু বই সংগ্রহ করেছিলেন ।
এই গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি অনুধাবন করেন যে, কোরআনের পরিবেশবান্ধব বার্তা এবং জীবনদর্শন বর্তমান একুশ শতকের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা । সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল যে, ১৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও কোরআনের একটি বিন্দু বা চিহ্নও পরিবর্তিত হয়নি । অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো যেখানে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, সেখানে কোরআনের এই অলৌকিকতা এবং অপরিবর্তনীয় সত্যই ইভন রিডলিকে ইসলামের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
শাহাদাহ গ্রহণ: আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম এবং একটি নতুন পরিচয়
কোরআনের আয়াতগুলো যখন তার হৃদয়ে আলো ছড়াতে শুরু করল, তখন তার দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক সংকটের অবসান ঘটল। তিনি বুঝতে পারলেন, প্রকৃত নারী স্বাধীনতা পশ্চিমা সমাজের খোলামেলা পোশাকের মধ্যে নেই, বরং আত্মার পবিত্রতা এবং স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের মাঝে নিহিত।
২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ বন্দিদশা থেকে মুক্তির প্রায় দুই বছর পর, ইভন রিডলি অবশেষে সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তিনি অত্যন্ত আবেগের সাথে কালেমা পাঠ করে শাহাদাহ গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি অনুভব করলেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি গর্বের সাথে ঘোষণা করলেন, “আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সেরা পরিবারে যোগ দিয়েছি; যখন আমরা একসাথে থাকি, তখন আমরা অপরাজেয়” ।
তার এই ধর্মান্তর কেবল একটি ধর্ম পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল তার পুরোনো সত্তার মৃত্যু এবং নতুন সত্তার জন্ম। তিনি তার পুরোনো উচ্ছৃঙ্খল জীবনধারা, মদ্যপান এবং ফ্লিট স্ট্রিটের “প্যাটসি স্টোন” পরিচয় সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেন । এই সিদ্ধান্ত তার পরিবার এবং বন্ধুদের মধ্যে চরম বিস্ময় এবং হতাশার জন্ম দিলেও, তিনি তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল । তিনি ইসলামে এমন এক অনন্য প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তাকে তার পূর্ববর্তী ভাঙা দাম্পত্য জীবন এবং পেশাগত অস্থিরতা থেকে মুক্ত করেছিল ।
হিজাব ও নারীবাদের নতুন সংজ্ঞা
পশ্চিমা সমাজে মুসলিম নারীদের হিজাব বা নিকাব পরিধানকে প্রায়শই নারী নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ব্রিটিশ রাজনীতিক জ্যাক স্ট্র, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন এবং লেখক সালমান রুশদি যখন নিকাবকে “অবাঞ্ছিত বাধা” (unwelcome barrier) হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনা করেন, তখন ইভন রিডলি এর জোরালো প্রতিবাদ করেন ।
ইসলাম গ্রহণের পর রিডলি নিজে হিজাব পরিধান করতে শুরু করেন। তার মতে, হিজাব কেবল এক টুকরো কাপড় নয়, এটি একটি সুরক্ষা কবচ। এটি একজন নারীকে সমাজের অশালীন দৃষ্টি থেকে দূরে রাখে এবং মানুষকে তার বাহ্যিক রূপের বদলে তার মেধা ও কথার ওপর গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে । তিনি বলেন, “হিজাব পরার পর থেকে কেউ আর আমাকে অশালীন জোকস শোনায়নি বা অযাচিত প্রস্তাব দেয়নি। এটি বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে আমি একজন মুসলিম: আমাকে মদ বা বেকনের স্যান্ডউইচ অফার করবেন না, আমার সাথে সিরিয়াস বিষয়ে কথা বলুন” ।
তিনি জোরালোভাবে যুক্তি দেন যে, ইসলামে নারীদের আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষা এবং মূল্যের দিক থেকে পুরুষদের সমান বিবেচনা করা হয় । সম্মান রক্ষার্থে জোরপূর্বক বিয়ে, নারী নির্যাতন বা তথাকথিত “অনার কিলিং”-এর মতো বিষয়গুলোকে তিনি অজ্ঞতাপূর্ণ সাংস্কৃতিক কুপ্রথা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যার সাথে প্রকৃত ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই । তিনি মুসলিম নারীদের আহ্বান জানান, তারা যেন কোরআনকে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরুষতন্ত্রের (misogyny) বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ।
হজ্বের অভিজ্ঞতা এবং মুসলিম উম্মাহর একতা
নওমুসলিম ইভন রিডলির জীবনের অন্যতম সেরা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ছিল পবিত্র হজ্ব পালন। মক্কায় লাখ লাখ মানুষের ভিড় দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন, যা তাকে তার মুসলিম শেকড়ের বিশালতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।
একবার নামাজের জন্য হারাম শরীফের দিকে যাওয়ার সময় তিনি চারদিকের চরম বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করেন। হাজার হাজার মানুষ ধাক্কাধাক্কি করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ যখন আযান ধ্বনিত হলো, মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ শান্ত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল । এই দৃশ্যটি তাকে গভীরভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, পৃথিবীর কোনো আধুনিক সেনাবাহিনীও এত দ্রুত এবং নিখুঁত শৃঙ্খলায় আসতে পারে না। তিনি অনুভব করলেন, তিনি আল্লাহর এক বিশাল এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অংশ। বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ এবং জাতীয়তার মানুষ এক আযানের ডাকে এক হয়ে যাওয়া তাকে আবেগে কাঁদিয়ে ফেলেছিল ।
তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, মক্কার এই নামাজের সারির ঐক্য যদি মুসলিম উম্মাহ তাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ধরে রাখতে পারত, তবে মুসলিম বিশ্ব আজ অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অপরাজেয় হতো । তিনি ইরাক এবং ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলোতে মুসলিমদের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা স্মরণ করে বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান ।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা
ইভন রিডলির ধর্মান্তর কেবল একটি ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক যাত্রা ছিল না, এটি তার রাজনৈতিক দর্শনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিশোর বয়স থেকেই তিনি লেবার পার্টির (Labour Party) সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকে অবৈধ আগ্রাসন চালায়, তখন এর প্রতিবাদে তিনি লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন ।
পরবর্তীতে তিনি ২০০৪ সালে প্রখ্যাত যুদ্ধবিরোধী নেতা জর্জ গ্যালওয়ে এবং সালমা ইয়াকুবের সাথে মিলে বামপন্থী ‘রেসপেক্ট পার্টি’ (Respect Party)-তে যোগ দেন । তিনি দলটির ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইউরোপীয় নির্বাচনসহ একাধিক সংসদীয় নির্বাচনে (যেমন ২০০৪ সালের লিসেস্টার সাউথ এবং ২০১২ সালের রদারহ্যাম উপনির্বাচনে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন । রেসপেক্ট পার্টি মূলত ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা, ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি, এবং পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল । ২০১৪ সালে তিনি এই দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি স্কটিশ স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন এবং স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (SNP), অ্যালবা পার্টি (Alba Party) এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অফ ব্রিটেন’-এ যোগদান করেন ।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার। তিনি হামাসকে ফিলিস্তিনিদের বৈধ নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সমর্থন করেছেন এবং গাজার উপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন । এছাড়া, তিনি গুয়ান্তানামো বে-র বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘কেজপ্রিজনার্স’ (Cageprisoners)-এর একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং ড. আাফিয়া সিদ্দিকীর (Prisoner 650) প্রতি হওয়া অবিচারের তদন্তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন । তিনি ইন্টারন্যাশনাল মুসলিম উইমেন্স ইউনিয়ন-এর ইউরোপীয় প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপীয় মুসলিম লিগ-এর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ।
গণমাধ্যম ও সাহিত্যে ইভন রিডলির অবদান
ইসলাম গ্রহণের পর ইভন রিডলি কেবল রাজনীতির মাঠেই নয়, বরং লেখালেখি এবং সম্প্রচার মাধ্যমের দ্বারাও ইসলামের একজন বলিষ্ঠ ডিফেন্ডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তার জীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এবং তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো বই রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- In the Hands of the Taliban (ইন দ্য হ্যান্ডস অব দ্য তালেবান): এই বইটি তার আফগানিস্তানে বন্দি জীবনের একটি প্রামাণ্য দলিল। এখানে তিনি তার ভয়, তালেবানদের আচরণ, অন্যান্য বন্দিদের সাথে তার সম্পর্ক এবং তার ব্যক্তিগত সংঘাতের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন । বইটি তালেবান সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের একপেশে ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
- Ticket to Paradise (টিকিট টু প্যারাডাইস): এটি তার লেখা একটি প্রশংসিত উপন্যাস, যা ৯/১১ পরবর্তী বিশ্বের পটভূমিতে রচিত ।
- The Rise of the Prophet Muhammad: Don’t Shoot the Messenger: ২০১৯ সালে কেমব্রিজ স্কলারস পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, তার সামরিক কৌশল, এবং সমকালীন বিশ্বের প্রেক্ষাপট একজন অমুসলিম বা পশ্চিমা পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ।
মিডিয়া জগতেও তিনি সমান সক্রিয় ছিলেন। তিনি কাতারে আল জাজিরা (Al Jazeera) ইংলিশ ওয়েবসাইটের অন্যতম সিনিয়র এডিটর হিসেবে এর প্রতিষ্ঠালগ্নে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন । পরবর্তীতে তিনি ‘প্রেস টিভি’ (Press TV) এবং ‘ইসলাম চ্যানেল’-এর মতো নেটওয়ার্কগুলোতে রাজনৈতিক উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। তার নির্মিত তথ্যচিত্রগুলোর মধ্যে ‘Guantanamo: Inside the Wire’ এবং ‘In Search of Prisoner 650’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উন্মোচন করে ।
ইসলামফোবিয়া ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের দ্বিচারিতা সমালোচনা
একজন প্রাক্তন মূলধারার পশ্চিমা সাংবাদিক হিসেবে ইভন রিডলি খুব ভালো করেই জানতেন কীভাবে গণমাধ্যম জনমতকে প্রভাবিত করে। তিনি পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলামফোবিয়ার (Islamophobia) তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, পশ্চিমা মিডিয়া পরিকল্পিতভাবে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সরকারগুলোর সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
উদাহরণস্বরূপ, অরল্যান্ডোর ‘পালস’ (Pulse) নাইটক্লাবে হামলার পর পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে সমকামীদের প্রতি নির্দিষ্ট বিদ্বেষের (homophobia) মূল ঘটনাটিকে এড়িয়ে গিয়ে শুধুমাত্র ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’-এর ধোঁয়া তুলেছিল, তার কড়া সমালোচনা করেছিলেন রিডলি । তিনি তার কলামে উল্লেখ করেন যে, মিডিয়া অত্যন্ত সুকৌশলে সমকামী সম্প্রদায়ের শোককে পাশ কাটিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে মেতে উঠেছিল। তিনি তার বৈশ্বিক লেকচারগুলোতে বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, চরমপন্থা কোনো ধর্মের অংশ নয় এবং পশ্চিমা সরকারগুলো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে প্রায়শই ইসলামকে বলির পাঁঠা বানায় ।
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ইভন রিডলি কে এবং তিনি কেন বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত?
ইভন রিডলি একজন প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক, লেখিকা, এবং যুদ্ধবিরোধী অধিকারকর্মী। ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেনের পর ‘দ্য সানডে এক্সপ্রেস’-এর হয়ে আফগানিস্তানে ছদ্মবেশে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তালেবানের হাতে বন্দি হওয়ার ঘটনা তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীতে তার ইসলাম গ্রহণ তাকে আরও বেশি আলোচিত করে তোলে।
২. ইভন রিডলি কখন এবং কী কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন?
ইভন রিডলি ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তালেবানদের হাতে বন্দি থাকার সময় তিনি তাদের একজন ধর্মীয় নেতাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, মুক্তি পেলে তিনি কোরআন পড়বেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কোরআন অধ্যয়ন করে তিনি ইসলামে নারী অধিকারের ব্যাপকতা এবং কোরআনের অপরিবর্তনীয় সত্যে মুগ্ধ হয়ে ধর্মান্তরিত হন।
৩. তালেবানের হাতে বন্দি থাকার সময় ইভন রিডলির সাথে কেমন আচরণ করা হয়েছিল?
নিজ দেশে ফিরে তিনি স্বীকার করেন যে, বন্দি অবস্থায় তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ, অনশন এবং গালিগালাজ করলেও তালেবান যোদ্ধারা তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছিল। তারা তাকে “অতিথি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল এবং তার সাথে কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার করেনি, যা পশ্চিমা মিডিয়ার প্রচারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
৪. “ইন দ্য হ্যান্ডস অব দ্য তালেবান” বইটি কী সম্পর্কে লেখা?
“ইন দ্য হ্যান্ডস অব দ্য তালেবান” হলো ইভন রিডলির লেখা একটি বিশ্বখ্যাত আত্মজৈবনিক বই। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে তার ১১ দিনের বন্দিজীবন, তার ব্যক্তিগত মৃত্যুভয়, এবং পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার বিপরীতে তালেবানদের প্রকৃত আচরণের নিখুঁত বিবরণ এই বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে।
৫. ইসলামে নারী অধিকার নিয়ে একজন প্রাক্তন পশ্চিমা নারীবাদী হিসেবে ইভন রিডলির দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ইভন রিডলি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পশ্চিমা নারীবাদীরা ১৯৭০-এর দশকে যে অধিকারগুলোর (সম্পত্তি, শিক্ষা, বিবাহ বিচ্ছেদ) জন্য লড়াই করেছিল, কোরআন তা ১৪০০ বছর আগেই মুসলিম নারীদের দিয়েছে। তার মতে, ইসলামে নারীর আধ্যাত্মিকতা ও অধিকার পুরুষের সমান এবং জোরপূর্বক বিয়ে বা নারী নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো সম্পূর্ণ স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রথা, ইসলামের অংশ নয়।
(এই গবেষণা প্রতিবেদনটি ইভন রিডলির জীবনের ঐতিহাসিক তথ্যাবলি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাক্ষাৎকার, রাজনৈতিক কর্মজীবন এবং তার নিজের লেখা বইগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এটি বৈশ্বিক রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব এবং সত্য সন্ধানী পাঠকদের জন্য একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও অনুপ্রেরণাদায়ক দলিল।)



























