I. সাংস্কৃতিক রোগের উৎস: হীনমন্যতা ও ভুল ধারণা
মুহাম্মদ আসাদের মতে, পাশ্চাত্য জীবনধারা ও মূল্যবোধের অন্ধ অনুকরণ ইসলামী সভ্যতার অস্তিত্ব বা পুনরুজ্জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ 1। তিনি সভ্যতাকে কেবল একটি ফাঁপা কাঠামো বা পোশাক হিসেবে দেখেন না; এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যার বাইরের রূপ এবং ভেতরের আত্মা অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত 1।
এই সাংস্কৃতিক রোগের উৎপত্তি হয়েছে মুসলিমদের গভীর হতাশা থেকে। মুসলিমরা যখন পাশ্চাত্যের বস্তুগত শক্তি ও অগ্রগতি দেখল এবং এর বিপরীতে নিজেদের সমাজের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখল, তখন তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা জন্মাল যে, ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রগতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় 1। এই ‘আলোকিত’ মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা এমন এক মারাত্মক ভুল করলেন যে, তাঁরা ইসলামের চিরন্তন মৌলিক আইন শরিয়াহ-কে বর্তমান যুগের স্থবির, মানবসৃষ্ট আইনশাস্ত্র ফিকহ-এর (Jurisprudence) সঙ্গে এক করে দেখলেন 1। তাঁদের মনে হলো যে শরিয়াহ আধুনিক বিশ্বের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ। ফলস্বরূপ, তাঁরা পশ্চিমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়মাবলি গ্রহণ করাকেই উন্নতির একমাত্র পথ হিসেবে ধরে নিলেন—এটি ছিল নিজেদের ধর্মের প্রতি এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়বাদ 1।
II. বাইরের অনুকরণ কীভাবে আত্মাকে পরিবর্তন করে (পোশাকের দর্শন)
যে যুক্তি দেওয়া হয় যে পোশাক বা জীবনধারা পরিবর্তন করা আধ্যাত্মিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, মুহাম্মদ আসাদ তাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন 1। তিনি ব্যাখ্যা করেন, একটি জাতির পোশাক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তা সেই জাতির রুচি ও প্রয়োজনের দীর্ঘদিনের বিকাশের ফল 1। পশ্চিমা পোশাক গ্রহণ করার মাধ্যমে মুসলিমরা অচেতনভাবে পশ্চিমের রুচির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয় এবং তাদের নিজস্ব মানসিকতাকে এমনভাবে পরিবর্তন করে ফেলে যে তা নতুন পোশাকের সাথে “মানিয়ে যায়” 1।
লেখক প্রশ্ন তোলেন: পোশাকের মতো একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ বিষয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, এটি “সাংস্কৃতিক আত্ম-বিক্রয়” (cultural serfdom)-এর দিকে নিয়ে যায় 1। যখন একজন মুসলিম পশ্চিমা পোশাক, আচার-আচরণ ও জীবনযাত্রার পদ্ধতি অনুকরণ করেন, তখন তিনি কার্যত তার ঐতিহ্যবাহী রুচি, নান্দনিক মূল্যবোধ এবং পছন্দ-অপছন্দ ত্যাগ করেন 1। এই প্রক্রিয়ায়, তিনি একটি বিদেশী সভ্যতার “নৈতিক দাসত্ব” (moral serfdom)-এর পোশাক পরিধান করেন, কারণ বাইরের রূপগুলি ভেতরের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে 1। এই সত্যটিরই স্বীকৃতি মেলে নবী (সাঃ)-এর হাদীসে: “যে ব্যক্তি অন্য কোনো কওমের (জাতি) অনুকরণ করবে, সে তাদেরই একজন হয়ে যাবে” (মুসনাদ ইবনে হাম্বল, সুনান আবি দাউদ) 1। বাইরের অনুকরণের মাধ্যমে একটি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী সভ্যতার আত্মার প্রশংসা করা অসম্ভব নয়, কিন্তু তা ভালো মুসলিম থাকার পথে চরম বাধা 1।
III. সীমারেখা নির্ধারণ: অনুকরণের ক্ষেত্রে করণীয়
অনুকরণের এই প্রবণতার মূলে রয়েছে হীনমন্যতা বোধ (inferiority complex) 1। এর থেকে মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হলো “ক্ষমা চাওয়ার” মানসিকতা (spirit of apology) ঝেড়ে ফেলা এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা নিয়ে গর্বিত হওয়া 1।
মুসলিমদের করণীয় হলো পাশ্চাত্য থেকে কেবল বিজ্ঞান ও পদ্ধতি গ্রহণ করা, কিন্তু তার আত্মা নয়। এই প্রসঙ্গে আসাদ ইউরোপীয় রেনেসাঁসের উদাহরণ টেনেছেন 1। রেনেসাঁসের সময় ইউরোপ আরবের জ্ঞান ও পদ্ধতির প্রভাব গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তারা কখনোই আরবীয় সংস্কৃতির বাহ্যিক রূপ বা আত্মার অনুকরণ করেনি; বরং তারা এই জ্ঞানকে “তাদের নিজস্ব মাটিতে সার হিসেবে ব্যবহার করেছিল” 1। এর ফলস্বরূপ ইউরোপের নিজস্ব সভ্যতা শক্তিশালী হয়।
এই মডেল অনুসরণ করে, মুসলমানদের উচিত পশ্চিমের অর্জন থেকে শুধুমাত্র বিজ্ঞান (exact sciences) এবং গাণিতিক জ্ঞান গ্রহণ করা 1। কারণ জ্ঞান নিজেই সার্বজনীন 1। কিন্তু পশ্চিমা দর্শন, সাহিত্য এবং ইতিহাস পরিহার করা উচিত। এর কারণ:
১. বস্তুবাদী চেতনা: পশ্চিমা সভ্যতা বস্তুবাদী এবং ধর্ম-বিরোধী ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত 1। তাদের দর্শন, সাহিত্য এবং ইতিহাসের ব্যাখ্যা এই বস্তুবাদী চেতনায় পরিপূর্ণ।
২. জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার: পশ্চিমা ইতিহাস, বিশেষত রোমানদের প্রাচীন “সভ্য বনাম বর্বর” দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে 1, পশ্চিমা জাতিগুলির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়, যা মুসলিম যুবকদের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি করে 1।
৩. নৈতিক অসঙ্গতি: পাশ্চাত্য সামাজিক কাঠামোর অপরিহার্য কিছু দিক, যেমন পুঁজির ভিত্তি হিসেবে সুদের (ribā) ব্যবহার, অথবা নারী-পুরুষের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী 1। এই সামাজিক রূপগুলির অনুসরণ ইসলামের অস্তিত্বের ওপর মারাত্মক আঘাত হানে।
IV. উন্মুক্ত পথের দিকে: সুন্নাহর অপরিহার্যতা
অনুকরণের এই প্রবণতা মুসলিম জগৎকে তাদের অতীতের সঙ্গে সংযোগকারী বন্ধনগুলি ধীরে ধীরে ছিন্ন করছে 1। এর ফলে তারা তাদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক শিকড় হারাচ্ছে। আসাদের ভাষায়, এটি সেই গাছের মতো যা শিকড় আলগা হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে 1।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য কেবল একটি পথই খোলা—তা হলো সচেতনভাবে নবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ-কে অনুসরণ করা 1। সুন্নাহ হলো ইসলামের শিক্ষাকে বাস্তবে রূপদান করা, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বের ধারণা প্রতিফলিত করার নির্দেশনা দেয় 1। এই মোড়ে দাঁড়িয়ে মুসলিমদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে: হয় পাশ্চাত্যের দিকে যেতে হবে এবং তাদের অতীতকে চিরতরে বিদায় জানাতে হবে, অথবা “Towards the Reality of Islam” লেখা রাস্তাটি বেছে নিতে হবে, যা কেবল অতীতে বিশ্বাসী এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে জীবন্ত করে তুলতে পারে 1। সুন্নাহ-কেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদের সমস্ত বিদেশী প্রভাবকে বিচার করতে হবে—এটাই ইসলামের পুনরুজ্জীবনের একমাত্র শর্ত।
তথ্যসূত্র:
1 মুহাম্মদ আসাদ। ইসলাম অ্যাট দ্য ক্রসরোডস (Islam at the Crossroads), ১৯৩৪।




























