আধুনিক যুগের সাংস্কৃতিক মানচিত্র: একমুখী আগ্রাসনের সংকট
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে “স্থানের বিজয়” (the conquest of space) 1 দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতি তার মৌলিক নিয়মে বিশ্বাস করে যে জাতিগুলির মধ্যে পণ্যের আদান-প্রদান পারস্পরিক (mutual) হওয়া আবশ্যক; কোনো জাতি দীর্ঘমেয়াদে কেবল ক্রেতা বা কেবল বিক্রেতা থাকতে পারে না। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই নির্মম অর্থনৈতিক নিয়মটি অনুপস্থিত 1।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে যে সভ্যতাগুলি “বেশি শক্তিশালী” (more virile) 1, তারা স্বভাবতই দুর্বল বা কম সক্রিয় সম্প্রদায়ের উপর একতরফা আকর্ষণ এবং প্রভাব বিস্তার করে। বর্তমানে পশ্চিম ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই গতিশীলতা স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য। মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে পশ্চিমা প্রযুক্তি, সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণার নিছক “ক্রেতা” হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু নিজেদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে পশ্চিমে কোনো কার্যকর “ইতিবাচক প্রেরণা বিক্রি” করতে পারছে না 1।
এই পরিস্থিতি কেবল বাণিজ্যিক বা সামরিক দুর্বলতার ফল নয়, এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক মনোপসনি (একমুখী বাজারের আধিপত্য) তৈরি করেছে। যখন একটি সমাজ তার নিজস্ব ঐতিহ্যের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন সে কেবল অন্য সমাজের পণ্যই ক্রয় করে না, বরং তাদের বস্তুবাদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলে। সামরিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা থেকে অর্থনৈতিক দুর্বলতা আসে, যা সমাজকে সাংস্কৃতিক ধারণার ক্রেতা বানিয়ে দেয়। এর ফলস্বরূপ, সমাজ নিজস্ব নৈতিক শক্তির ‘বিক্রয়’ করতে ব্যর্থ হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় আত্ম-পরিচয় ও সৃজনশীলতার অভাব। এটি মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে। যদি মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন যে পশ্চিমা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিয়ম গ্রহণ না করলে বিশ্বপ্রগতির সাথে তাল মেলা সম্ভব নয়, তবে তারা অনুকরণ ও হীনমন্যতার ফাঁদে পড়েন 1। অনুকরণ কেবল বাহ্যিক রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সেই রূপের অন্তর্নিহিত বস্তুবাদী ও ধর্ম-বিমুখ চেতনাকেও আমদানি করে, যা ইসলামের সামগ্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই একমুখী নির্ভরতা সাংস্কৃতিক আত্মহত্যার শামিল।
জীবনের মূলসূত্র: ইসলামের স্বকীয় প্রস্তাবনা ও আধ্যাত্মিক সুরক্ষা
ইসলামকে প্রায়শই ভুলভাবে এমন একটি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস হিসাবে দেখা হয় যা যেকোনো সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে। তবে এর প্রবক্তারা জোর দেন যে ইসলামকে অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত ব্যবস্থা, একটি স্ব-পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক কক্ষপথ (self-sufficing orbit of culture and a social system) হিসেবে বুঝতে হবে 1। ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিকতাকে সমর্থন করে না, বরং এটি একটি স্ব অভ্যন্তরীণ, স্বজ্ঞাত অভিজ্ঞতার (inner, intuitive experience) মাধ্যমে এমন একটি একক ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়, যা একটি সর্বোচ্চ সৃজনশীল শক্তির (supreme Creative Power) অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল 1।
এই ধর্মীয় উপলব্ধি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং জৈবিক গঠনের একটি স্বাভাবিক ফল। মানব মস্তিষ্ক জীবন, জন্ম, মৃত্যু এবং অসীমের রহস্য ব্যাখ্যা করতে অক্ষম, এবং এখানেই ধর্মের পথ শুরু হয় 1। এই উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির সাথে এক আধ্যাত্মিক সাদৃশ্যে আসে এবং ইতিবাচকভাবে ধার্মিক ব্যক্তি একটি গভীর “আধ্যাত্মিক সুরক্ষার” অনুভূতি লাভ করে 1। ধর্মীয় উপলব্ধির অভাবে, মানুষ নিজের আত্ম-সচেতন সত্তা এবং বাহ্যিক, আপাতদৃষ্টিতে দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রকৃতিকে (seemingly irresponsible Nature) একটি দ্বন্দ্বময় অবস্থানে দেখতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সংঘাতের সমাধান হয়; কারণ ধর্মীয় উপলব্ধির আলোয় মানুষ বুঝতে পারে যে তার নিজস্ব চেতনা এবং তাকে ঘিরে থাকা প্রকৃতি উভয়ই একই সৃজনশীল ইচ্ছার সমন্বিত প্রকাশ 1।
এই কাঠামো স্পষ্টভাবে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে, যা ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত, মানসিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। ইসলামী অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নয়; এটি একটি সুসংজ্ঞায়িত ব্যবস্থা যা অনিবার্যভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের দিকগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আধুনিক বিশ্বে বস্তুগত জ্ঞান বৃদ্ধির ফলে যখন অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন ইসলামী কাঠামো একটি স্থির, সর্বজনীন পরিকল্পনায় (universal plan) বিশ্বাসের মাধ্যমে মানসিক স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য (আশা ও ভয়ের মধ্যে ভারসাম্য) প্রদান করে 1। এই স্থিতিশীলতা মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের জন্য অপরিহার্য অভ্যন্তরীণ শক্তি সরবরাহ করতে পারে।
III. কর্ম ও বিশ্বাসের অখণ্ডতা: ইবাদতের ব্যাপক অর্থ
ইসলামী জীবন পদ্ধতির একটি মৌলিক পার্থক্য হলো কর্ম ও ধারণার মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য ঐক্য 1। ইসলাম শুধু এই শিক্ষা দেয় না যে জীবন ঐশী একত্ব (Divine Oneness) থেকে উদ্ভূত, বরং এটি ইবাদতের এমন ধারণা দেয় যেখানে উপাসনা (ইবাদত) কেবল আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা বা রোজা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি “মানুষের বাস্তব জীবনের সামগ্রিকতার” উপর বিস্তৃত হয় 1।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, জীবনের সমস্ত কাজ, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ কাজগুলিও, অবশ্যই সচেতনভাবে ইবাদতের কাজ হিসাবে সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ, একজন মুসলিমকে তার জীবনের প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সর্বজনীন পরিকল্পনার (God’s universal plan) অংশ হিসেবে দেখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমেই মানুষ তার অস্তিত্ব এবং চেতনায় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাতে পারে 1।
ইসলামিক উপাসনার দুটি প্রতীকী উদাহরণ এই সামগ্রিকতার ধারণাটিকে স্পষ্ট করে:
১. সালাত (নামাজ): ইসলামি সালাত আধ্যাত্মিক একাগ্রতার সঙ্গে শারীরিক নড়াচড়ার সমন্বয় ঘটায় 1। সমালোচকরা একে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা বললেও, এর গভীরে রয়েছে এক দার্শনিক তাৎপর্য: মানুষের জীবন নিজেই এই দুটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত; তাই আল্লাহ্র নিকটবর্তী হওয়ার জন্য মানুষের সমস্ত ক্ষমতা ও দিককে একত্রে ব্যবহার করা উচিত 1।
২. তাওয়াফ (কাবা প্রদক্ষিণ): কাবা প্রদক্ষিণ প্রতীকীভাবে বোঝায় যে মানুষের বাস্তব কার্যকলাপ, প্রচেষ্টা এবং কর্মকে আল্লাহর একত্বের ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে হবে 1। এটি কুরআনের একটি আয়াতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ:
“আমি অদৃশ্য সত্তা এবং মানবজাতিকে [জানা এবং] আমার উপাসনা করা ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি” (সূরা ৫১:৫৬) 1।
সালাত ও তাওয়াফের এই উদাহরণগুলি ইসলামের হোলিস্টিক (সামগ্রিক) প্রকৃতির উপর জোর দেয়। পশ্চিমা সভ্যতায় যেখানে শরীরকে প্রায়শই পাপের উৎস হিসেবে দেখা হয় অথবা কেবল বস্তুগত উপযোগিতার মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়, সেখানে ইসলামে শরীর ও আত্মা অবিচ্ছেদ্য এবং উপাসনার মাধ্যম। যেহেতু ইবাদত জীবনের সামগ্রিকতাকে আবৃত করে, তাই ইসলামী আইন (শরিয়াহ) কেবলমাত্র ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি অনিবার্যভাবে সমাজের সমস্ত দিক, যেমন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি মুসলিম সমাজ পশ্চিমা সামাজিক রূপগুলি, যেমন সুদ-ভিত্তিক অর্থনীতি বা নৈতিকতার অনুপস্থিতি গ্রহণ করে, তবে তারা কেবল নৈতিকতা নয়, বরং ইবাদতের মৌলিক সংজ্ঞাকেই বাতিল করে দেয় 1।
IV. মানুষ: সিদ্ধির পথে এক স্বাধীন সত্তা
ইসলাম মানুষের প্রকৃতি এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক স্বতন্ত্র ধারণা পোষণ করে, যা অন্যান্য ধর্মীয় ব্যবস্থার থেকে ভিন্ন। ইসলাম জোর দিয়ে বলে যে অন্যান্য ধর্মীয় ব্যবস্থার বিপরীতে, ব্যক্তিগত সিদ্ধি (individual perfection) আমাদের পার্থিব জীবনেই সম্ভব 1। এই সিদ্ধি পার্থিব সম্ভাবনা এবং প্রাকৃতিক গুণাবলীর পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে।
এই সিদ্ধি আপেক্ষিক (relative) এবং এটি ব্যক্তির “ইতিমধ্যে বিদ্যমান, ইতিবাচক গুণাবলীকে” বিকশিত করার মাধ্যমে অর্জিত হয় 1। ইসলামে কোনো আদর্শিক “সাধু” বা তপস্বীর মতো আদর্শিক প্রকারের (standardized ‘types’) প্রয়োজন নেই। মানুষের জন্য জীবনের বৈচিত্র্য (individual variety) আল্লাহর একটি আইন, এবং ইসলাম কোনো দমনমূলক ধর্ম নয়; বরং এটি মানুষকে তার ব্যক্তিগত প্রকৃতি অনুযায়ী ইতিবাচক বিকাশের সুযোগ দেয় 1। একজন ব্যক্তি আইনগত সীমার মধ্যে যেমন তপস্বী হতে পারে, তেমনি পার্থিব ভোগও উপভোগ করতে পারে 1।
খ্রিস্টান ধারণা যে মানুষ জন্মগতভাবে পাপী, এর বিপরীতে ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষ জন্মগতভাবে পাপী নয়, বরং সে বিশুদ্ধ এবং সম্ভাব্যভাবে নিখুঁত (pure and potentially perfect) অবস্থায় জন্ম নেয়। কুরআন এই ধারণাকে সমর্থন করে:
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম আকৃতিতে” (সূরা ৯৫:৪) 1।
অতএব, মন্দ বা পাপ মানুষের মৌলিক অংশ নয়; এটি মানুষের সচেতন জীবনের একটি অর্জন, যা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সহজাত গুণাবলীর অপব্যবহারের ফলে ঘটে।
ইসলামে কোনো বংশগত পাপ বা সার্বজনীন মুক্তি নেই। মুক্তি এবং ধ্বংস সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত। এই শিক্ষানুসারে, “প্রত্যেক মুসলমানই নিজের মুক্তিদাতা” 1। কুরআনের আয়াত এটি নিশ্চিত করে:
“মানুষ যা চেষ্টা করে, তা ছাড়া তার জন্য আর কিছুই নেই” (সূরা ৫৩:৩৯) 1।
এই ধারণাটি মুসলিমদের মধ্যে একটি প্রবল আশাবাদ জাগিয়ে তোলে। এটি মানুষকে নিজস্ব মুক্তিদাতা হিসেবে ঘোষণা করে, যা সমাজে সক্রিয়ভাবে পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক শক্তি যোগায়। যেহেতু সিদ্ধি আপেক্ষিক, তাই এটি ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্ব এবং তার বিভিন্ন গুণাবলীকে সম্মান করে, ইসলামী কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতাকে অনুমোদন করে।
V. সক্রিয় জীবন: বস্তুবাদ ও বৈরাগ্যবাদের ঊর্ধ্বে ইসলামের মধ্যপন্থা
ইসলাম পার্থিব জীবনের মূল্য এবং মানুষের সক্রিয়তার ক্ষেত্রে চরম বস্তুবাদ এবং চরম বৈরাগ্যবাদের মধ্যে এক ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। ইসলাম পার্থিব জীবনকে “শান্ত এবং শ্রদ্ধার” চোখে দেখে 1। এটি আধুনিক পশ্চিমের বস্তুবাদী আশাবাদ (“My kingdom is of this world alone”) বা খ্রিস্টানদের জীবন-অবজ্ঞাকে (“My kingdom is not of this world”) গ্রহণ করে না 1।
পার্থিব জীবন উচ্চতর অস্তিত্বের দিকে একটি প্রয়োজনীয় এবং ইতিবাচক মঞ্চ, যার মূল্য পুরোপুরি উপকরণগত (instrumental value) 1। এই জীবন আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য একটি জাগতিক কাঠামো নির্মাণে সহায়ক 1। এই মধ্যপন্থার প্রতিফলন কুরআনের প্রার্থনায় দেখা যায়:
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালেও কল্যাণ দাও এবং পরকালেও কল্যাণ দাও!” (সূরা ২:২০১) 1।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বস্তুগত সমৃদ্ধি কাম্য, তবে তা নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। সমস্ত ব্যবহারিক কার্যকলাপের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করা, যা মানুষের নৈতিক শক্তি বিকাশের জন্য সহায়ক হবে 1। এই প্রসঙ্গে একটি কঠোর নৈতিক অবস্থান হচ্ছে: নৈতিক জ্ঞান স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের উপর নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করে। কেবল ভালো-মন্দ তাত্ত্বিকভাবে জানা, কিন্তু পৃথিবীতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা না করাকে “স্থূল অনৈতিকতা” (gross immorality) হিসেবে বিবেচনা করা হয় 1। নৈতিকতা কর্মের মাধ্যমে পৃথিবীতে তার বিজয় প্রতিষ্ঠা করার মানবিক প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থানই ইসলামের “আক্রমণাত্মক সক্রিয়তা” (aggressive activism) এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা (আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার) করার প্রচেষ্টার নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে 1।
ইসলামী নৈতিকতার এই ব্যবহারিকতা পশ্চিমা নৈতিকতা থেকে স্বতন্ত্র। পশ্চিমা নৈতিকতা প্রায়শই নিষ্ক্রিয় বা তাত্ত্বিক হতে পারে, কিন্তু ইসলামী নৈতিকতা অবশ্যই সক্রিয় ও সমাজে প্রভাবশালী হতে হবে। গসপেলের বিখ্যাত উক্তি, “সিজারকে সিজারের এবং ঈশ্বরকে ঈশ্বরের প্রাপ্য দাও” -কে প্রত্যাখ্যান করতে হবে1। কারণ ইসলামে সবকিছুই ঈশ্বরের, এবং এটি নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক চাহিদার মধ্যে কোনো সংঘাত স্বীকার করে না 1। এর অর্থ হলো, পশ্চিমা রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্র পৃথক, ইসলামের সামগ্রিক ইবাদতের ধারণাকে ভেঙে দেওয়ায় তা অগ্রহণযোগ্য।
নিম্নে ইসলামী জীবনের ধারণা, পাশ্চাত্য বস্তুবাদ এবং খ্রিস্টান বৈরাগ্যবাদের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্যগুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
ইসলামী জীবনের ধারণা: পাশ্চাত্য বস্তুবাদ ও খ্রিস্টান বৈরাগ্যবাদের মধ্যপথ
| ধারণার ক্ষেত্র (Area of Concept) | ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি (Islamic Viewpoint) | আধুনিক পাশ্চাত্য (Modern West) | খ্রিস্টান বৈরাগ্যবাদ (Christian Asceticism) |
| পার্থিব জীবনের মূল্য | উচ্চতর অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয়, ইতিবাচক মঞ্চ; উপকরণগত মূল্য 1। | বস্তুবাদী আশাবাদ: জীবনই একমাত্র রাজ্য (“My kingdom is of this world alone”) 1। | জীবন-অবজ্ঞা: বৈরাগ্য ও দুঃখের উপত্যকা (“My kingdom is not of this world”) 1। |
| সিদ্ধি ও পূর্ণতা | আপেক্ষিক সিদ্ধি ইহলৌকিক জীবনে অর্জনযোগ্য; ব্যক্তিগত ইতিবাচক গুণাবলীর বিকাশ 1। | বস্তুগত আধিপত্য ও নিরন্তর বৈজ্ঞানিক/সামাজিক উন্নতি। | শারীরিক ও পার্থিব আকাঙ্ক্ষার দমন; আদি পাপের মোচন দ্বারা মুক্তি। |
| মানুষের প্রকৃতি | জন্মগতভাবে বিশুদ্ধ ও সম্ভাবনাময়; পাপ অর্জনকৃত, মৌলিক নয় 1। | বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক বিবর্তনভিত্তিক; বস্তুবাদ দ্বারা চালিত। | আদি পাপের ধারণা দ্বারা ভারাক্রান্ত; শরীর শয়তানের ক্ষেত্র। |
| উপাসনা ও কর্মের স্থান | কর্ম ও ধারণার ঐক্য; জীবনের সামগ্রিক ইবাদত (ইবাদত) 1। | ব্যবহারিক উপযোগিতা ও ক্ষমতা; নৈতিকতা অপ্রাসঙ্গিক (যদি না এটি উপযোগিতা বাড়ায়)। | আনুষ্ঠানিকতা ও কেবল আধ্যাত্মিক একাগ্রতা; আধ্যাত্মিক ও দৈহিক জগতের বিচ্ছেদ। |
| নৈতিক সক্রিয়তা | পৃথিবীতে ন্যায় ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য; নৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ‘স্থূল অনৈতিকতা’ 1। | সুবিধা ও লাভের ভিত্তিতে নৈতিকতা পরিবর্তনশীল (Utilitarianism)। | ব্যক্তিগত মুক্তি ও বিশ্বাসের উপর জোর; পার্থিব সমাজ সংস্কার গৌণ। |
VI. সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষা, পুনর্জাগরণ এবং ভবিষ্যতের দিশা
আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা তার কার্যক্রম এবং আকাঙ্ক্ষায় ব্যবহারিক উপযোগিতা এবং গতিশীল বিবর্তন দ্বারা চালিত। এই সভ্যতা বস্তুগত অগ্রগতি এবং আরামকে তার আসল ধর্ম বানিয়েছে। এর ফলে, পশ্চিমা সমাজে নৈতিকতা কেবল ব্যবহারিক উপযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ 1। পারিবারিক বন্ধন বা যৌন বিশ্বস্ততার মতো নৈতিকভাবে মূল্যবান গুণাবলী দ্রুত তাদের গুরুত্ব হারাচ্ছে, কারণ এগুলি সমাজের বস্তুগত কল্যাণে তাৎক্ষণিক অবদান রাখে না 1। এই সভ্যতা, যা ক্ষমতা এবং ভোগের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কৃতির জন্য “মারণ বিষ” 1 হিসেবে বিবেচিত।
মুসলিম সমাজের জন্য পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ এক চরম বিপদ। এই অনুকরণ হীনমন্যতা থেকে আসে; মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, পশ্চিমা শক্তি ও দক্ষতার সাথে তাল মেলাতে হলে পশ্চিমা পথই একমাত্র পথ 1। কিন্তু বাহ্যিক পোশাক, রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রার অনুকরণ ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দাসত্বের দিকে নিয়ে যায়, কারণ বাহ্যিক রূপগুলি অভ্যন্তরীণ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। এই সত্যটিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে গিয়ে বলা হয়েছে: “যে অন্য লোকদের অনুকরণ করে সে তাদেরই একজন হয়ে যায়” 1। মুসলিমরা যখন পশ্চিমা সামাজিক ফর্ম গ্রহণ করে, তখন তারা অজান্তেই সেই নৈতিক শূন্যতা গ্রহণ করে যা পশ্চিমা সমাজে পারিবারিক বন্ধন এবং শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলিকে শিথিল করে দিয়েছে 1।
সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষার জন্য, মুসলিমদের অবশ্যই তাদের ধর্ম ও সামাজিক কাঠামোর জন্য “ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা” (spirit of apology) 2 সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে। একজন মুসলিমকে তার স্বতন্ত্রতা নিয়ে গর্বিত হতে হবে এবং এই ভিন্নতাকে একটি মূল্যবান গুণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অন্য সাংস্কৃতিক বৃত্তের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয় 2। শুধুমাত্র জ্ঞান-বিজ্ঞান (natural sciences) এবং গণিত ছাড়া পশ্চিমা সভ্যতার স্পিরিট, জীবনধারা বা সামাজিক সংগঠনের অনুকরণ ইসলামের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক আঘাত 1।
ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া অপরিহার্য। এই পুনর্জাগরণ বাইরের সংস্কারের মাধ্যমে নয়, বরং অভ্যন্তরের সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব 1। মুসলিমদের অলসতা, আত্মতুষ্টি এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার প্রয়োজন, ইসলামের মৌলিক নীতির নয়।
সুন্নাহ (নবীর জীবন আদর্শ) হলো ইসলামের “লৌহ কাঠামো” (iron framework) 1। এটি কুরআনের একমাত্র বাধ্যবাধক ব্যাখ্যা (only binding explanation) এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের উপায় হিসেবে বিবেচিত 1। সুন্নাহকে অনুসরণ না করলে কুরআনের শিক্ষাকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়, যার ফলে ইসলামের সামগ্রিক কাঠামো ধ্বংস হতে পারে। আধুনিকবাদীরা প্রায়শই হাদীস (যা সুন্নাহর উৎস) কে “অনির্ভরযোগ্য ঐতিহ্যের” ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। তাদের এই মনোভাবের পেছনে অনেক সময়ই ব্যক্তিগত সুবিধা বা পশ্চিমা জীবনধারার সাথে মানিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। এটি কেবল ইসলামের নৈতিক ও ব্যবহারিক কোডকে ধ্বংস করে না, বরং যুক্তিবাদের নামে আত্মকেন্দ্রিকতা ও খেয়ালিপনাকেও উৎসাহিত করে 1।
VII. উপসংহার: আত্মবিশ্বাসের সাথে উন্মুক্ত পথে যাত্রা
মুসলিম জগৎ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে না যে ইসলাম একটি “নিঃশেষিত শক্তি” (spent force) 1। বরং, মুসলিম সমাজে যে অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তা ইসলামের নয়, বরং মুসলিমদের হৃদয়ের “মৃত্যু ও শূন্যতার” ফল, যা তাদের চিরন্তন ঐশী বাণী শুনতে অপারগ করে তুলেছে 1।
মুসলিম সমাজ তিনটি পথের মুখোমুখি: প্রথম পথ স্থবিরতা, যার ফল মৃত্যু; দ্বিতীয় পথ পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ, যার ফল আত্মপরিচয়ের বিনাশ; এবং তৃতীয় পথটি হলো “ইসলামের বাস্তবতার দিকে” ফেরা 1।
পুনর্জাগরণের জন্য মুসলিমদের অবশ্যই তাদের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং পশ্চিমা সভ্যতার অনুকরণের স্পিরিট ত্যাগ করতে হবে। ইসলামকে “সংস্কার” করার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ এর নীতিগুলি নিজেই নিখুঁত। তবে মুসলিমদের নিজেদের আচরণ এবং অলসতাকে সংস্কার করতে হবে। আমাদের অবশ্যই ইসলামী আদর্শকে নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে, বাইরের কোনো শক্তিকে নয়।
এই পথে অগ্রগতির একমাত্র উপায় হলো সচেতনভাবে, ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলের সুন্নাহকে অনুসরণ করা। সুন্নাহ হলো ইসলামের শিক্ষাকে কর্মে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি। এর মাধ্যমেই বোঝা যাবে পশ্চিমা সভ্যতার কোন দিকগুলি গ্রহণ করা যেতে পারে (যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) এবং কোন দিকগুলি অবশ্যই বর্জন করতে হবে (যেমন নৈতিক দর্শন ও সামাজিক কাঠামো) 1। কুরআনের চূড়ান্ত আহ্বান হলো:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللّٰهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُو اللّٰهَ وَالْيَوْمَ الْاٰخِرَ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে” (সূরা ৩৩:২১) 1।
সুন্নাহকে অনুসরণ করাই ইসলামের বাস্তবতাকে অনুসরণ করা এবং এই পথই মুসলিম সমাজকে আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যতের উন্মুক্ত পথে নিয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- মুহাম্মদ আসাদ। ইসলাম অ্যাট দ্য ক্রসরোডস (Islam at the Crossroads), ১৯৩৪।




























