আত্মপরিচয়ের সংকট: পশ্চিমের বৈরী মনস্তত্ত্ব
আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং ইসলামী জীবনদর্শনের মধ্যে যে কেবল আধ্যাত্মিক অসঙ্গতি বিদ্যমান, তা-ই নয়; বরং এর পাশাপাশি মুসলমানদের পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুকরণ থেকে বিরত থাকার আরেকটি গভীর ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। পশ্চিমের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ইসলামের প্রতি এক অদ্ভুত বৈরিতার দ্বারা গভীরভাবে রঞ্জিত 1।
এই বৈরিতার বংশগতি সুপ্রাচীন। প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানরা কেবলমাত্র নিজেদেরকেই ‘সভ্য’ বলে গণ্য করত এবং ভূমধ্যসাগরের পূর্বে বসবাসকারী সবকিছুকে ‘বর্বর’ বলে মনে করত 1। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা এই ধারণা থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত যে অ-ইউরোপীয় জাতিদের প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা দেখানো তাদের মনস্তত্ত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্য 1। এই কারণেই পাশ্চাত্য বিশ্বের মনোভাব অন্যান্য ধর্ম (যেমন বৌদ্ধ বা হিন্দু দর্শন) সম্পর্কে কেবল উদাসীন হলেও, ইসলামের ক্ষেত্রে এটি “গভীর-মূল এবং প্রায় ধর্মান্ধ বিতৃষ্ণা” প্রকাশ করে, যার মধ্যে একটি তীব্র আবেগগত রঙ থাকে 1। পশ্চিমের মানসিকতার এই মৌলিক অসঙ্গতিই সাংস্কৃতিক অনুকরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
বিদ্বেষের উৎস: ক্রুসেডের স্থায়ী প্রভাব
ইউরোপীয় মনের উপর ক্রুসেডের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং স্থায়ী, যা আজকের পশ্চিমা মনস্তত্ত্বকেও প্রভাবিত করে চলেছে। ইউরোপ যখন তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনা লাভ করছিল, ঠিক সেই সময়েই ক্রুসেডগুলি শুরু হয়েছিল 1। ইউরোপের “শৈশবকালে” প্রাপ্ত এই সহিংস ছাপগুলি স্থায়ীভাবে তার গণ-মনস্তত্ত্বে গেঁথে গিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তা আর সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি 1।
ক্রুসেডের মাধ্যমেই ইউরোপ প্রথমবারের মতো নিজেকে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে—যা ছিল মূলত ইসলাম জগতের বিরুদ্ধে একটি ঐক্য (“Christendom”) 1। ফলস্বরূপ, ইসলাম বিদ্বেষই পশ্চিমের সম্মিলিত চেতনার জন্মলগ্নের সঙ্গী হয়েছিল। এই সংঘাত কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ ছিল না, বরং চার্চের দ্বারা উৎসাহিত ইচ্ছাকৃত ভুল উপস্থাপনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় মনে বিদ্বেষের বীজ বপন করেছিল 1। এই সময়েই ইউরোপের মনে ইসলামের বিরুদ্ধে “বর্বর সহিংসতা” ও “স্থূল ইন্দ্রিয়পরায়ণতার” মতো ভিত্তিহীন ধারণাগুলি স্থায়ীভাবে প্রবেশ করে 1।
বৌদ্ধিক বিচ্যুতি: প্রাচ্যবিদদের পক্ষপাতিত্ব
পশ্চিমের এই ঐতিহাসিক বিদ্বেষ কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিতদের মধ্যেও দৃশ্যমান। লেখক জোর দিয়ে বলেছেন যে ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও ইসলামের উপর লেখায় “অবৈজ্ঞানিক পক্ষপাতিত্বের” জন্য দোষী 1। তারা প্রায়শই ইসলামকে এমন একজন অভিযুক্তের মতো মনে করেন যিনি বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন 1।
তাদের গবেষণার কৌশল মধ্যযুগের ইনকুইজিশন আদালতের পদ্ধতির কথা মনে করিয়ে দেয়। তারা কখনও মুক্ত মন নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্যগুলি তদন্ত করেন না, বরং পূর্বনির্ধারিত কুসংস্কার দ্বারা পরিচালিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তথ্য নির্বাচন করেন 1। এর ফলস্বরূপ ইসলামের একটি “অদ্ভুতভাবে বিকৃত চিত্র” পশ্চিমা সাহিত্যে উঠে আসে 1। যদিও গত অর্ধ শতাব্দীতে প্রাচ্যবিদদের লেখায় সুর এবং পদ্ধতির উন্নতি হয়েছে 1, তবুও সাধারণ মানুষের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ এবং ভারসাম্যহীন মনোভাব এখনও রয়ে গেছে।
বিদ্বেষের ধারাবাহিকতা: ‘জাতিগত প্রবৃত্তি’র রূপান্তর
ক্রুসেডের পরও এই বৈরী মনোভাব বিভিন্ন রূপে অব্যাহত ছিল। স্পেনে মুসলিমদের উচ্ছেদের জন্য খ্রিস্টানদের উৎসাহিত করা হয়েছিল এই বিদ্বেষের কারণেই। এছাড়াও কনস্টান্টিনোপলের পতনে (১৪৫৩ সালে তুর্কিদের হাতে) ইউরোপের শত্রুতা আরও তীব্র হয়েছিল, যা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে 1।
একদিকে রেনেসাঁসের সময় ইউরোপ আরবি সংস্কৃতি থেকে বিপুলভাবে উপকৃত হলেও, ইসলামের প্রতি তার পুরাতন বিদ্বেষ কমেনি 1। এমনকি অষ্টাদশ শতকের চার্চ-বিরোধী দার্শনিক ভলতেয়ারও ইসলামের কট্টর বিদ্বেষী ছিলেন 1। এই ঘৃণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি “জাতিগত প্রবৃত্তি” (atavistic instinct)-এ পরিণত হয়েছে—একটি গভীর-মূল মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা যা ধর্মের বিলুপ্তি সত্ত্বেও পশ্চিমা চেতনায় স্থায়ীভাবে রয়ে গেছে 1। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামের প্রতি পশ্চিমা বিরোধিতা একটি বহিরাগত ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের একটি মৌলিক অংশ।
মুসলিম আশাবাদের ভুল হিসাব
সেই সময়ের মুসলিম পর্যবেক্ষকদের তীব্র সমালোচনা করা উচিত যারা বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিম ইসলামকে গ্রহণ করার দিকে ঝুঁকছে। এটি একটি “বাস্তবতা থেকে দূরত্ব” সৃষ্টিকারী ভুল ধারণা 1।
বাস্তবতা হলো, পশ্চিম এখনও তার বৈষয়িক অর্জন এবং আরামের আরাধনায় সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত 1। আধুনিক বিজ্ঞান হয়তো “একটি অভিন্ন সৃষ্টিকর্তা শক্তির” অস্তিত্ব স্বীকার করে, কিন্তু এটি সেই শক্তির চেতনা বা উদ্দেশ্যের বিষয়ে কিছু বলে না 1। এটি অতীন্দ্রিয় ইসলামী ধারণার দিকে কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং কেবল বস্তুবাদকেই একটি “আরও পরিমার্জিত বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে” উন্নীত করে 1।
পশ্চিমের কমতে থাকা বিদ্বেষ ইসলামের প্রতি তার প্রশংসা নয়, বরং ইসলামের সাংস্কৃতিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব হারানোর কারণে সৃষ্ট উদাসীনতা মাত্র 1। পশ্চিমে কিছু ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ করা বা ধর্মীয় মিশনগুলির উপস্থিতি সামগ্রিক পশ্চিমা মানসিকতার পরিবর্তনের প্রমাণ বহন করে না; বরং এটি প্রায়শই কেবল “রোমান্টিকভাবে-প্রবণ” মানুষের উপর ‘বহিরাগত’ ধর্মমতের আকর্ষণের ফল 1।
এই ধরনের আশাবাদকে “বিপজ্জনক, আত্ম-প্রতারণামূলক আশাবাদ” হিসেবে গণ্য করা যায় 1। এই ভুল আশা মুসলমানদের নিজেদের সাংস্কৃতিক নৈকট্য এবং পশ্চিমের বিধ্বংসী প্রভাব অনুধাবন করা থেকে বিরত রাখে এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করে 1।
উপসংহার: আত্মার অনুকরণ বর্জন
এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে আসাদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, পশ্চিমা সভ্যতা তার ঐতিহাসিক বিদ্বেষ, বৈষয়িক দর্শন এবং আত্ম-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত যেকোনো সংস্কৃতির জন্য “একটি মারাত্মক বিষ” হতে বাধ্য 1।
মুসলমানদের অবশ্যই নিজেদের ধর্ম ও সামাজিক কাঠামোর জন্য “ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা” (spirit of apology) 1 পরিহার করতে হবে। সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষার জন্য, একজন মুসলিমকে তার স্বতন্ত্রতা নিয়ে গর্বিত হতে হবে এবং এই ভিন্নতাকে একটি মূল্যবান গুণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে 1। মুসলমানদের উচিত পশ্চিম থেকে শুধুমাত্র সঠিক এবং ফলিত বিজ্ঞানের (exact and applied sciences) ক্ষেত্রে প্রেরণা গ্রহণ করা 1। এর বেশি কিছু করা, অর্থাৎ পশ্চিমের চেতনা, জীবনধারা এবং সামাজিক সংগঠনকে অনুকরণ করা, “ইসলামের অস্তিত্বের উপর একটি মারাত্মক আঘাত হানা ছাড়া আর কিছুই নয়” 1।
তথ্যসূত্র:
1 মুহাম্মদ আসাদ। ইসলাম অ্যাট দ্য ক্রসরোডস (Islam at the Crossroads), ১৯৩৪।




























