আধুনিক মুসলিম সমাজের একটি গভীর সংকট হলো তারা ধীরে ধীরে তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা জীবনধারার প্রতি অন্ধ আকর্ষণ এবং নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি হীনমন্যতা মুসলিম জাতিকে এমন এক পথে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে তারা ইসলামের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছে। এই প্রসঙ্গে মুহাম্মদ আসাদ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেছেন, সুন্নাহ হলো ইসলামের অস্তিত্বের জন্য একটি “লৌহ কাঠামো”—যা ছাড়া ইসলামের পুনরুজ্জীবন কল্পনাই করা যায় না। সুন্নাহকে উপেক্ষা করা মানেই ইসলামের পতন ও অবক্ষয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া।
এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব, হাদীস ও সুন্নাহ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আধুনিক মুসলিমদের সংশয়ের কারণ কী, এবং কীভাবে সুন্নাহ ছাড়া ইসলামের প্রকৃত চেহারা অস্পষ্ট ও বিকৃত হয়ে যেতে পারে।
সুন্নাহ কী এবং কেন এটি ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ?
সুন্নাহ শব্দটি শুনলেই অনেকে ভাবেন এটি হয়তো ইসলামের একটি ঐচ্ছিক বা গৌণ অংশ। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুন্নাহ হলো নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মনোভাব, কাজ এবং বক্তব্যের সমষ্টি—যা আমাদের সামনে একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত। নবীজির (সাঃ) পুরো জীবনই ছিল কুরআনের একটি “জীবন্ত ব্যাখ্যা ও দৃষ্টান্ত”। তিনি শুধু কথায় নয়, বরং কাজে এবং প্রতিটি আচরণে কুরআনের শিক্ষাকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন।
ইসলামের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনের মধ্যে একটি নিখুঁত সমন্বয় তৈরি করেছে। অন্যান্য ধর্ম যেখানে আধ্যাত্মিকতাকে পার্থিব জীবন থেকে আলাদা করে ফেলেছে, ইসলাম সেখানে উভয়কে একসাথে নিয়ে চলার পথ দেখিয়েছে। আর এই সমন্বয়ের জীবন্ত নমুনা হলেন নবী মুহাম্মদ (সাঃ)। তাঁর নেতৃত্ব কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক—জীবনের সবগুলো দিককে পূর্ণাঙ্গভাবে আলিঙ্গন করেছিল।
এই কারণেই সুন্নাহকে কুরআনের পরে ইসলামিক আইনের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কুরআন হলো মূল ভিত্তি, কিন্তু তার ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগের জন্য সুন্নাহই একমাত্র বাধ্যতামূলক উপায়। কুরআনের কিছু আয়াত সংক্ষিপ্ত, কিছু নির্দেশনা সাধারণ প্রকৃতির—এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে নবী (সাঃ) কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়িত করেছেন। কারণ কুরআনের শিক্ষাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নবী (সাঃ) থেকে উত্তম আর কেউ হতে পারে না। তিনি ছিলেন সেই মহান ব্যক্তি যাঁর ওপর কুরআন নাযিল হয়েছিল এবং যিনি সেই শিক্ষাকে জীবনে প্রতিফলিত করেছিলেন।
হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা: একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি
আজকের যুগে, বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মুসলিমের মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—তারা হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমে পুরো সুন্নাহর কাঠামোটিকেই প্রত্যাখ্যান করতে চান। তাদের যুক্তি হলো, হাদীস তো মানুষের মুখে মুখে বর্ণিত হয়েছে, এতে ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু এই ধারণাটি মূলত হাদীস সংকলনের ঐতিহাসিক পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকেই উদ্ভূত।
বাস্তবতা হলো, হাদীস সংকলনের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং বৈজ্ঞানিক। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম এবং অন্যান্য হাদীস সংকলকরা প্রতিটি হাদীসের সত্যতা যাচাই করার জন্য এমন এক সূক্ষ্ম ও কঠোর পরীক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, যা পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা অন্য কোনো ঐতিহাসিক নথির ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োগ করেন না। তাঁরা শুধু হাদীসের শব্দগুলো সংগ্রহ করেননি, বরং প্রতিটি বর্ণনাকারীর জীবনী, তাঁর নৈতিক চরিত্র, স্মৃতিশক্তি, এবং হাদীস গ্রহণ ও প্রেরণের পদ্ধতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেছেন।
এই কারণেই মুসলিম উম্মাহ ইলমুল হাদীস (علم الحديث) নামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান গড়ে তুলেছিল, যেখানে হাদীসের অর্থ, শব্দগত বিশুদ্ধতা, এবং সংক্রমণ পথ (isnad) অনুসন্ধানের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন তৈরি করা হয়েছিল। শুধুমাত্র সেইসব বর্ণনাকারীকেই নির্ভরযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হতো, যাদের জীবনযাত্রা, সততা, এবং হাদীস বর্ণনার পদ্ধতি নির্ধারিত মানদণ্ডের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
শুধু তাই নয়, সাহাবীরা নবীজির (সাঃ) ব্যক্তিত্ব দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তাদের পক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর বাণী নিয়ে মিথ্যা বলা একেবারেই অসম্ভব ছিল। নবী (সাঃ) নিজে সতর্ক করেছিলেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার স্থান করে নেয়” (সহীহ বুখারী, সুনান আবি দাউদ, জামি’ আত-তিরমিযী)। এই হাদীস সাহাবীদের মনে এত গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে, তাঁরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন ছিলেন।
আধুনিক মুসলিমরা কেন সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করতে চায়?
এখন প্রশ্ন আসে, যদি হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা এত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাহলে আধুনিক মুসলিমরা কেন এটিকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়? মুহাম্মদ আসাদের মতে, এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক কারণ নেই—বরং এটি সম্পূর্ণভাবে আবেগগত এবং মনস্তাত্ত্বিক।
বর্তমান যুগের অনেক মুসলিম পশ্চিমা জীবনধারা, তাদের স্বাধীনতার ধারণা, এবং তাদের বস্তুগত সমৃদ্ধি দেখে মুগ্ধ। তারা মনে করেন, পশ্চিমা সভ্যতার মতো অগ্রসর হতে হলে তাদের জীবনযাত্রাও পশ্চিমাদের মতো হতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, পশ্চিমা জীবনযাত্রা এবং ইসলামী সুন্নাহ অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী। পশ্চিমা সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সুদভিত্তিক অর্থনীতি, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে নৈতিক শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি—এই সবকিছুই ইসলামী শিক্ষার বিপরীত।
তাই, যারা পশ্চিমা সভ্যতাকে অনুকরণ করতে চায়, তারা একটি সহজ পথ বেছে নেয়—তারা সুন্নাহকে “অপ্রাসঙ্গিক” বা “বাধ্যতামূলক নয়” বলে ঘোষণা করে। এরপর তারা কুরআনের আয়াতগুলোকে নিজেদের ইচ্ছামতো এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, যাতে তা পশ্চিমা সভ্যতার চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু এভাবে তারা আসলে ইসলামকে বিকৃত করে ফেলে এবং এর মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়।
সৈনিক ও জেনারেল: সুন্নাহ অনুসরণের আধ্যাত্মিক যৌক্তিকতা
অনেকেই প্রশ্ন করেন, সুন্নাহর প্রতিটি নির্দেশনার পেছনে কারণ যদি আমি না বুঝি, তাহলে আমি কেন সেটি মানব? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে মুহাম্মদ আসাদ একটি অত্যন্ত চমৎকার উপমা ব্যবহার করেছেন—সৈনিক ও জেনারেলের উপমা।
কল্পনা করুন, একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আছে। তার জেনারেল তাকে একটি কৌশলগত অবস্থান দখল করার নির্দেশ দিলেন। এখন, একজন ভালো সৈনিক কী করবে? সে অবিলম্বে সেই আদেশ পালন করবে। হয়তো আদেশ পালন করার সময় সে বুঝতে পারবে যে তার জেনারেলের এই নির্দেশের পেছনে একটি বড় কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল—হয়তো এই অবস্থান দখলের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বা তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। যদি সৈনিকটি এই গভীর উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তবে তা তার জন্য ভালো এবং তার আনুগত্য আরও দৃঢ় হবে।
কিন্তু যদি সৈনিকটি তাৎক্ষণিকভাবে তার জেনারেলের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে, তাহলে কি তার আদেশ মানা বন্ধ করে দেওয়া উচিত? অবশ্যই না। কারণ সে বিশ্বাস করে যে তার জেনারেল তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ, তার কাছে সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র আছে, এবং তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। তাই, বুঝুক বা না বুঝুক, সৈনিকের কর্তব্য হলো আদেশ মেনে চলা।
ঠিক একইভাবে, মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) হলেন মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ নেতা এবং পথপ্রদর্শক। তিনি যে নির্দেশই দিয়েছেন, তার পেছনে অবশ্যই আমাদের আধ্যাত্মিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য একটি গভীর কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা সেই উদ্দেশ্য এখনই বুঝতে পারি বা না পারি, তার আদেশ মেনে চলা আমাদের ঈমানের দাবি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর দেওয়া পথই সঠিক।
অনেক সময় আমরা হয়তো পরবর্তীতে বুঝতে পারি—আহা, এই কারণেই নবীজি (সাঃ) এই কাজটি করতে বলেছিলেন! এই উপলব্ধি আমাদের ঈমান আরও দৃঢ় করে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়ায়। কিন্তু যদি কোনো কারণে আমরা সেই গভীর উদ্দেশ্য না-ও বুঝতে পারি, তাহলেও আমাদের ঈমানের ভিত্তিতে সুন্নাহ অনুসরণ করা আমাদের দায়িত্ব।
উপসংহার: সুন্নাহ ছাড়া ইসলাম অসম্পূর্ণ
আমাদের বুঝতে হবে, সুন্নাহ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। এটি ইসলামের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য একটি লৌহ কাঠামো, যার ওপর পুরো ইসলামী জীবনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। সুন্নাহ ছাড়া কুরআনের ব্যাখ্যা হয়ে যায় ব্যক্তিগত মতামত নির্ভর, বিভ্রান্তিকর এবং বিকৃত। আধুনিক মুসলিমদের উচিত পশ্চিমা জীবনধারার অন্ধ অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে সুন্নাহর প্রতি আত্মবিশ্বাসী হওয়া এবং নিজেদের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে সগর্বে ধারণ করা। কারণ সুন্নাহই হলো সেই মাপকাঠি, যার মাধ্যমে আমরা ইসলামের প্রকৃত বাস্তবতাকে বুঝতে পারি এবং জীবনে প্রয়োগ করতে পারি


























