ভিন্নমুখী চালিকা শক্তি: উপযোগবাদ বনাম আল্লাহ-সচেতনতা
আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার চালিকা শক্তি হলো ব্যবহারিক উপযোগিতা (practical utility) এবং গতিশীল বিবর্তন (dynamic evolution) 1। আধুনিক ইউরোপীয় বা আমেরিকানদের কাছে জীবনের গভীর উদ্দেশ্য বা অর্থ নিয়ে প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে সমস্ত ব্যবহারিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তাদের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হলো জীবনের সম্ভাবনাসমূহ নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং প্রকৃতির উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব লাভ করা 1।
অন্যদিকে, ইসলাম বিশ্বাস করে যে মানুষের পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা ও অগ্রগতি লাভের নিয়তি রয়েছে (সূরা ২:৩০) 1। তবে ইসলামের ক্ষেত্রে, আধ্যাত্মিক বিবেচনাগুলি (spiritual considerations) সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং সবকিছুর ভিত্তি। এখানেই পাশ্চাত্য এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মূল পার্থক্যটি দৃশ্যমান হয়। পাশ্চাত্য যেখানে জীবনের বাহ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন, ইসলাম সেখানে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপকে চালিত করতে চায় 1।
প্রগতির ধারণা: বস্তুবাদ এবং নৈতিক ভ্রান্তি
পাশ্চাত্য চিন্তাধারার একটি মৌলিক ভুল হলো, তারা বস্তুগত জ্ঞান এবং আরামের বৃদ্ধিকে মানবজাতির নৈতিক উন্নতির সমার্থক বলে মনে করে 1। এই ভ্রান্তিটি আরও একটি গভীর ভুলের কারণে ঘটে: জীববৈজ্ঞানিক নিয়মগুলিকে (biological rules) আত্মার অস্তিত্বের মতো অ-জীববৈজ্ঞানিক তথ্যের (non-biological facts) উপর প্রয়োগ করা 1।
ইসলাম আত্মার অস্তিত্বকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে একটি বাস্তবতা হিসাবে দেখে এবং মানবজাতির সম্মিলিত সত্তার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে একটি “স্থির পরিমাণ” (static quantity) হিসাবে বিবেচনা করে—যা মানব প্রকৃতির গঠনের মধ্যেই নির্দিষ্টভাবে স্থাপন করা হয়েছে 1। অর্থাৎ, মানবজাতি সম্মিলিতভাবে আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এই ধারণা ইসলাম স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে। আধ্যাত্মিক উন্নতির গতিশীল উপাদানটি কেবল ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ 1।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ভারসাম্য আনতে কাজ করে কঠোর ইসলামী সামাজিক ধারণা। সমাজের কর্তব্য হলো মানুষের পার্থিব জীবনকে এমনভাবে বিন্যাস করা যাতে প্রতিটি ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বাধা এবং সর্বোচ্চ উৎসাহ পেতে পারে 1। এই কারণেই ইসলামী আইন, শরিয়াহ, মানুষের জীবনের আধ্যাত্মিক এবং বস্তুগত উভয় দিক, সেইসাথে তার ব্যক্তিগত এবং সামাজিক উভয় দিক নিয়ে উদ্বিগ্ন 1।
কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা একটি সর্বব্যাপী, অতীন্দ্রিয় নৈতিক আইন (transcendental moral law) মেনে চলার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেয় না। এর আসল উপাস্য আধ্যাত্মিক নয়: এটি হলো স্বাচ্ছন্দ্য (Comfort)। এর জীবন দর্শন হলো ক্ষমতার জন্য ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা (Will to Power for power’s sake) 1। এই উভয় ধারণা প্রাচীন রোমান সভ্যতা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, যা আধুনিক পশ্চিমা চেতনার ভিত্তি তৈরি করেছে।
রোমান উত্তরাধিকার এবং খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে সংঘাত
রোমান সাম্রাজ্য, যার ভিত্তি ছিল ক্ষমতা দখল এবং মাতৃভূমির সুবিধার জন্য অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর শোষণ, সম্পূর্ণ বস্তুবাদী জীবন ধারণায় চালিত ছিল 1। রোমানরা কখনও বাস্তবে ধর্মকে জানত না; তাদের দেবতা বা বিশ্বাস জীবন-নীতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারত না। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা সেই রোমান মাটি থেকেই জন্ম নিয়েছে 1। তাই, পাশ্চাত্য কঠোরভাবে ঈশ্বরকে অস্বীকার না করলেও, তার বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থায় ঈশ্বরের জন্য “কোনো স্থান বা ব্যবহার নেই” 1।
পশ্চিমা সভ্যতা খ্রিস্ট ধর্মের ফলশ্রুতি নয়, বরং খ্রিস্টান চার্চ এবং তার জীবন-দৃষ্টির বিরুদ্ধে পরিচালিত দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ফসল 1। খ্রিস্টান মতবাদ মানব প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করত, আদি পাপের ধারণায় জোর দিত এবং কৃচ্ছ্রসাধনের পক্ষে ছিল, যা পার্থিব জীবন ও মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করেছিল 1।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় মনের মুক্তি (রেনেসাঁ) বহুলাংশে আব্বাসীয় ও উমাইয়া যুগের ইসলামী কেন্দ্রগুলি (যেমন দামেস্ক, বাগদাদ, কর্ডোবা) থেকে প্রেরিত সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণার কারণে ঘটেছিল, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের সূচনা করেছিল 1। মধ্যযুগে চার্চের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সংস্কারের মাধ্যমে মেরামত করা যায়নি। ফলস্বরূপ, যখন ধর্মীয় শৃঙ্খল ভেঙে গেল, খ্রিস্টের ঈশ্বরের পুত্রত্ব নিয়ে প্রচলিত ধারণার কারণে ঈশ্বরকে মানবাকৃতিতে (anthropomorphic) দেখা হতো 1। আলোকিত যুগের পর, চিন্তাশীল ইউরোপীয়রা মানবীয় ঈশ্বরের ধারণা থেকে দূরে সরে যান এবং ফলস্বরূপ ঈশ্বর এবং ধর্মের ধারণাটিকেই প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেন।
ইউরোপের বর্তমান বস্তুবাদের মূলে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
১. মানবজীবন সম্পর্কে রোমান সভ্যতার সম্পূর্ণ বস্তুবাদী মনোভাব 1।
২. খ্রিস্টান চার্চের জীবন-অবজ্ঞা এবং মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার দমনের প্রতি বিদ্রোহ 1।
৩. ঈশ্বরের নরত্বারোপিত ধারণা (anthropomorphic conception of God) 1।
উপযোগবাদী নৈতিকতা এবং ইসলামী সভ্যতার সঙ্গে বিরোধ
এই পটভূমির ফলস্বরূপ, গড় পশ্চিমী মানুষ কেবল একটি “ধর্ম” জানে: বস্তুগত প্রগতির উপাসনা। এর লক্ষ্য হলো জীবনকে ক্রমাগত সহজ করে তোলা বা “প্রকৃতির থেকে স্বাধীন” করে তোলা 1। এই সমাজে নৈতিকতা কেবল ব্যবহারিক উপযোগিতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ, এবং ভালো-মন্দের সর্বোচ্চ মাপকাঠি হলো বস্তুগত সাফল্য 1। যে গুণাবলী বস্তুগত কল্যাণ নিশ্চিত করে (যেমন: প্রযুক্তিগত দক্ষতা, দেশপ্রেম), সেগুলিকে উচ্চ মূল্য দেওয়া হয়, কিন্তু যেগুলি বিশুদ্ধভাবে নৈতিক দিক থেকে মূল্যবান ছিল (যেমন: পারিবারিক বন্ধন, যৌন বিশ্বস্ততা), তা গুরুত্ব হারাতে থাকে, কারণ তারা সমাজের উপর “কোনো সুস্পষ্ট, বস্তুগত সুবিধা” প্রদান করে না 1।
এমনকি সোভিয়েত রাশিয়াও এই পশ্চিমা বিবর্তনের যৌক্তিক চূড়ান্ত পরিণতিকে উপস্থাপন করে 1। পুঁজিবাদী পশ্চিম এবং কমিউনিজম উভয়েরই মৌলিক প্রবণতা হলো মানুষের আধ্যাত্মিক স্বতন্ত্রতা এবং নৈতিকতাকে একটি সম্মিলিত কাঠামোর (society) বস্তুগত প্রয়োজনের কাছে সমর্পণ করা, যেখানে ব্যক্তি কেবল চাকার একটি অংশ 1।
অধ্যায়ের চূড়ান্ত উপসংহার হলো, এই ধরণের সভ্যতা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত যেকোনো সংস্কৃতির জন্য “একটি মারাত্মক বিষ” হতে বাধ্য 1। ইসলামে, নৈতিক বিবেচনাগুলি সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারিক বা উপযোগবাদী বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান পায়। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতায়, অবস্থানটি ঠিক উল্টো: উপযোগিতা নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে 1। পশ্চিমা সভ্যতার নৈতিক ভিত্তি ইসলামের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসঙ্গত। মুসলমানদের উচিত পশ্চিম থেকে শুধুমাত্র সঠিক এবং ফলিত বিজ্ঞানের (exact and applied sciences) ক্ষেত্রে প্রেরণা গ্রহণ করা। এর বেশি কিছু করা, অর্থাৎ পশ্চিমের চেতনা, জীবনধারা এবং সামাজিক সংগঠনকে অনুকরণ করা, “ইসলামের অস্তিত্বের উপর একটি মারাত্মক আঘাত হানা ছাড়া আর কিছুই নয়” 1।
তথ্যসূত্র:
1 মুহাম্মদ আসাদ। ইসলাম অ্যাট দ্য ক্রসরোডস (Islam at the Crossroads), ১৯৩৪।




























