বাংলা নববর্ষ পালন ও ইসলাম—এই বিষয়টি নিয়ে প্রতি বছরই মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। একদিকে এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব, অন্যদিকে এর ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে প্রায় অভিন্ন মত রয়েছে যে এটি জায়েজ নয়। কিন্তু কেন এমনটি বলা হয়? আধুনিক তরুণরা যেটিকে কেবলই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করে, তার শেকড় কি আসলেই কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে জড়িত?
এই আর্টিকেলে আমরা বাংলা নববর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
ইসলামের দৃষ্টিকোণে উৎসব পালন
ইসলামে যেকোনো কাজের গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। শিরক বা আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করা ইসলামের সবচেয়ে বড় গুনাহ। তাই যে উৎসবের মূলে শিরকের আশঙ্কা থাকে, তা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর একটি হাদীস এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য:
“যারা কোনো সম্প্রদায়ের (বা জাতির) অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)
এই হাদীস অনুযায়ী, যদি কোনো উৎসব বিধর্মীদের ধর্মীয় সংস্কৃতি বা আচারের অংশ হয়, তবে তা পালন করা মুসলমানদের জন্য জায়েজ নেই। সুতরাং, বাংলা নববর্ষ পালন ও ইসলাম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে এর উৎস খুঁজে বের করা আবশ্যক।
বাংলা নববর্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে, যা একে আরও জটিল করে তুলেছে।
১. কৃষি উৎসব হিসেবে এর সূচনা ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় নতুন ফসল তোলার পর কৃষকরা একটি উৎসব পালন করত, যা ‘হালখাতা’ নামেও পরিচিত। এটি ছিল মূলত একটি কৃষিভিত্তিক ও সর্বজনীন উৎসব, কারণ তৎকালীন বাংলার মানুষের জীবিকা ছিল কৃষিকেন্দ্রিক। তবে সময়ের সাথে সাথে এর বদলেছে এবং আধুনিক নববর্ষের বাণিজ্যিক রূপের সাথে সেই প্রাচীন কৃষি উৎসবের কোনো মিল নেই।
২. সম্রাট আকবরের ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ অনেকেই বলে থাকেন বাংলা নববর্ষের প্রবক্তা মুঘল সম্রাট আকবর কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতে হিজরী পঞ্জিকার পরিবর্তে বাংলা বর্ষের প্রবর্তন করেন। আকবর বাংলা বর্ষের প্রবর্তন করেন ১৫৮৪ সালে অর্থাৎ হিজরী ৯৯১ সালে। এ সময় থেকেই অর্থাৎ ৯৯১ হিজরী সন থেকেই বছরের গণনা চন্দ্র কেন্দ্রিক থেকে সূর্য কেন্দ্রিক এ পরিবর্তিত হয়। এ কারণেই ২০২৪ সালে এসে বাংলা সন ১৪৩১ (২০২৪-১৫৮৪=১৪৩১-৯৯১)। আর তার তারিখ-এ-এলাহীর ( বাংলা পঞ্জিকার নাম) বারো মাসের নাম ছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমার্দাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মিজ যা জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ তৈরি করেন।
৩. হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংযোগ আরেকটি ধারণা হচ্ছে, সম্রাট আকবরের অনেক আগেই বাংলা পঞ্জিকার প্রচলন ছিল আর তা মনে করা হয় ৭ম শতকের রাজা শশাঙ্ক যিনি বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভাবক (কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলা সনের হিসাব করলে প্রায় ১০০ বছরের গরমিল পাওয়া যায়)। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে, পহেলা বৈশাখ উৎসবটি ঐতিহ্যগত হিন্দু নববর্ষ উৎসবের সাথে সম্পর্কিত যা Vaisakhi (বৈশাখী ) ও অন্য নামে পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই দিনে এই উৎসব পালিত হয়। এই Vaisakhi-কে Baisakhi উচ্চারণও করা হয়। হিন্দু ও শিখগণ এই উৎসব পালন করে। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়।
নিশ্চিত ভাবেই আধুনিক যুগে এসে নববর্ষ যেভাবে পালিত হয় তা যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালির উৎসব বললে কেবল ভুলই হবে। বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নববর্ষের উৎসব হিন্দু ধর্মের একটি আদি উৎসব এবং তা শুধু বাঙালীই নয় অন্য জাতিও অন্য নামে পালন করে। এমনকি এটাও জানা যায় যে ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নববর্ষের উৎসবগুলো হিন্দু বিক্রমী দিনপঞ্জির সাথে সম্পর্কিত। এই দিনপঞ্জির নামকরণ করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে বিক্রমাদিত্যের নাম অনুসারে। ভারতের গ্রামীণ বাঙ্গালি সম্প্রদায়ে ভারতের অনেক অঞ্চল ও নেপালের মত বিক্রমাদিত্যকে বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাবের স্বীকৃতি দেয়া হয়।
আধুনিক নববর্ষ: সংস্কৃতি নাকি পুঁজিবাদ?
এই মিশ্র ইতিহাসগুলো বিশ্লেষণ করে নববর্ষ কে অন্তত কেবল বাঙালী জাতির ঐতিহ্যবাহী উৎসব বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। আর বর্তমান যুগে আমরা যেভাবে নববর্ষকে পালন করি সেটা কেবল পুঁজিবাদীদের একটি লাভের মাধ্যম ছাড়া আর কিছু বলা যায় বলে মনে হয় না। আজকের দিনে যেভাবে নববর্ষ পালিত হয়, তা হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য বলাটা যুক্তিসঙ্গত নয়। এর আধুনিক রূপ প্রথম দেখা যায় ১৯১৭ সালে, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনায় পূজা ও হোম কীর্তনের আয়োজন করা হয়। বর্তমানের বাণিজ্যিক এবং জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপন মূলত পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার একটি পণ্য, যার মূল লক্ষ্য ব্যবসা।
এই জন্যই সব মুসলিম ধর্মীও বক্তা নববর্ষ পালন মুসলমানদের জন্য জায়েজ নেই বলে থাকেন। তবে আমরা যদি সেই আদি কৃষি নববর্ষকে ফিরিয়ে আনতে পারি তবে হয়তোবা সেই নববর্ষ পালনে কোন বাধা থাকবে না।
উপসংহার: একজন মুসলিম বাঙালির ভাবনা
আমার নিজস্ব মত, আমি বাঙালী এটা কি শুধু নিরভর করে আমি কোন উৎসব পালন করব তার উপর? বাঙালী হয়ে আমি অন্য বাঙালীদের সহ্য করতে পারি না, রাস্তায় দেখা হলে এমন ভাবে মুখবিকৃতি করি যেন দিনটাই খারাপ গেলো, অন্য বাঙালীদের কোন উপকারে আসি না আর এক নববর্ষ পালন করে দাবি করি আমার মত বাঙালী নাই! অদ্ভুত!
বস্তুবাদী এই সব উৎসবে ইসলাম কখনো বিশ্বাস করে না। স্বজাতি প্রেম যদি থেকে থাকে জাতির উপকারে কাজে আসো, সৎ কর্ম কর অসৎ কাজে নিষেধ কর এতাই ইসলামের বিশ্বাস ।




























