হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মক্কার কুরাইশ গোত্রের বনূ জোহরা শাখার একটি সম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তি, যিনি চামড়া ও সুগন্ধির ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। পিতার ব্যবসা সারা আরবে বিস্তৃত ছিল এবং কুরাইশদের সাথে তারা শীতকালে ইয়েমেন ও গ্রীষ্মকালে সিরিয়ার দিকে ব্যবসার জন্য সফর করতেন।
পিতার মৃত্যুর পর যৌবনে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ তাঁর পূর্ণ গোত্রের সরদার হন এবং মক্কায় পিতার সমস্ত ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তিনি পিতার মতোই নিয়মিত ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ব্যবসার কাজে যাতায়াত করতে শুরু করেন।
ইসলাম গ্রহণ ও প্রাথমিক ত্যাগ
ইসলাম গ্রহণের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। মক্কার অন্যান্য বড় নেতারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিপক্ষে চলে যায় এবং নতুন মুসলমানদের উপর অত্যাচার শুরু করে। অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু সাহাবীকে আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করতে বলেন।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফও অন্যান্য নতুন মুসলমানদের সাথে মক্কায় তাঁর সমস্ত ব্যবসা ছেড়ে আবিসিনিয়ায় চলে যান। সেখানে তিনি শূন্য থেকে নতুন ব্যবসা গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সময় আবিসিনিয়ায় অবস্থানের পর তিনি মক্কায় ফিরে আসেন, যেখানে তাঁর বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত ছিল।
মদীনায় হিজরত ও সর্বস্ব ত্যাগ
যখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফের মদীনায় যাওয়ার সময় আসে, তখন মক্কার সকল বড় সরদার তাঁর কাছে এসে বসে এবং বলে যে তিনি যদি মক্কা ছেড়ে চলে যান তাহলে মক্কার সম্পূর্ণ অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। এতেই বোঝা যায় যে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের সম্পদ এতটাই বিশাল ছিল যে তাঁর চলে যাওয়ায় পুরো মক্কার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।
যখন তিনি তাদের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তখন তারা একটি শর্ত রাখে যে তিনি চাইলে যেতে পারেন, কিন্তু সমস্ত ব্যবসা ও সম্পদ মক্কায় রেখে যেতে হবে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফের সামনে দুটি বিকল্প ছিল: হয় মক্কায় থেকে একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে আরামে জীবনযাপন করা, অথবা সবকিছু ছেড়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে মদীনায় হিজরত করা এবং একজন গরিব মানুষ হিসেবে নতুন করে জীবন শুরু করা।
আব্দুর রহমান ইবনে আউফ কোনো দ্বিধা না করে সবকিছু মক্কায় ছেড়ে খালি হাতে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
মদীনায় নতুন জীবনের সূচনা
মদীনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। প্রতিটি মুহাজিরকে তাঁর পূর্বের মর্যাদা অনুযায়ী আনসারদের সাথে ভাই বানানো হতো – কৃষকের সাথে কৃষক, ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসায়ী। মক্কার সবচেয়ে ধনী সাহাবী হিসেবে আব্দুর রহমান ইবনে আউফকে মদীনার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি সা’দ ইবনে রাবী’র সাথে ভাই বানানো হয়।
সা’দ ইবনে রাবী’ তাঁকে বলেন, “আমি মদীনার অন্যতম ধনী ব্যক্তি। আমার ইচ্ছা হচ্ছে আমার যা কিছু আছে তার অর্ধেক আপনাকে দিয়ে দিই।” কিন্তু আব্দুর রহমান ইবনে আউফ উত্তর দেন, “আল্লাহ আপনার সম্পদ আরো বৃদ্ধি করুন। আমি শুধু একটি জিনিস চাই – আপনি আমাকে বাজারের রাস্তা দেখিয়ে দিন।”
ইহুদি নিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রবেশ
সা’দ ইবনে রাবী’ তাঁকে মদীনার সবচেয়ে বড় বাজার ইহুদিদের বাজারে নিয়ে যান। কারণ সে সময় মদীনার সমস্ত অর্থনীতির উপর ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীর নাম ছিল আবূ রাফে।
ইহুদিরা খুবই চালাকির সাথে মদীনার পুরো অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। যখনই কোনো ব্যবসায়ী কাফেলা মদীনার কাছে পৌঁছাত, মদীনায় পৌঁছানোর আগেই ইহুদিরা গোপনে গিয়ে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সস্তায় কিনে নিত এবং পরে সেই কাফেলা মদীনায় পৌঁছে আরবদের কাছে চড়া দামে পণ্য বিক্রি করত। আরবরা এই বিষয়টি জানত, কিন্তু তারা ইহুদিদের কিছু বলতে পারত না কারণ তাদের সকল বড় নেতারা ইহুদিদের কাছ থেকে সুদের ভিত্তিতে প্রচুর ঋণ নিয়েছিল।
প্রাথমিক ব্যবসায়িক কৌশল
আব্দুর রহমান ইবনে আউফের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইহুদিদের এই শক্তিশালী বাজারে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম দিন তিনি ইহুদিদের বাজারে এদিক-ওদিক ঘুরে মনোযোগ সহকারে বাজারটি পর্যবেক্ষণ করেন। গভীর পর্যবেক্ষণের পর তিনি বুঝতে পারেন কোন ব্যবসা তাঁর করা উচিত এবং কীভাবে এই বাজারে অর্থ উপার্জন করতে হবে।
কিন্তু সমস্যা ছিল যে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের কাছে ব্যবসা শুরু করার জন্য এক টাকাও ছিল না। তিনি সরাসরি একজন মুসলিম দোকানদারের কাছে গিয়ে তাঁর সাথে একটি চুক্তি করেন যে তিনি বিনা পয়সায় ঘি, মাখন ও খেজুর নিয়ে যাবেন এবং নিজের পদ্ধতিতে সেগুলো বিক্রি করে সন্ধ্যায় পুরো টাকা ফেরত দেবেন। লাভ তাদের অর্ধেক অর্ধেক হবে। অর্থাৎ পণ্য দোকানদারের এবং বিপণন তাঁর। এই ধরনের ব্যবসাকে আজ পর্যন্ত লাভ ভাগাভাগি ব্যবসা বা মুরাবাহা বলা হয়।
প্রাথমিক সাফল্য ও পণ্য উন্নয়ন
এই পণ্যগুলো নিয়ে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ মদীনার বাজারে ঘুরে কোনোভাবে সেগুলো বিক্রি করে সামান্য লাভ করেন। তাঁর অংশীদারকে পুরো টাকা ফেরত দিয়ে নিজের লাভ থেকে কিছু খাবারের জিনিস কিনে তাঁর ভাই সা’দ ইবনে রাবী’র ঘরে নিয়ে যান।
সা’দ ইবনে রাবী’ অবাক হয়ে যান যে যার কাছে সকালে কিছুই ছিল না, সন্ধ্যায় সে উল্টো তাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। এভাবে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ প্রতিদিন ইহুদিদের বাজারে যেতে শুরু করেন এবং সামান্য সামান্য লাভ করতে থাকেন।
কিছু সময় পর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ভাবেন যে কেন তিনি এই মাখন ও খেজুর মিশিয়ে একটি বিখ্যাত আরবীয় মিষ্টান্ন তৈরি করবেন না, যাকে ‘হাইস’ বলা হতো। তিনি সেরকমই করেন এবং এতে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের লাভ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ
যখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফের সম্পদ কিছুটা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন তিনি অন্যান্য ব্যবসার সাথে সাথে ঘোড়ার ব্যবসাও শুরু করেন এবং মদীনার লোকেরা তাঁর কাছ থেকে ঘোড়া কিনতে শুরু করে।
এখানে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ একটি বিষয় লক্ষ্য করেন যে যখনই কেউ তাঁর কাছ থেকে ঘোড়া কিনতে আসে, তাদের ঘোড়ার সাথে সাথে ঘোড়ার জিন ও অন্যান্য জিনিসপত্রেরও প্রয়োজন হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এই ব্যবসাও শুরু করেন। এরপর অবশেষে তিনি মদীনায় কাপড়, চামড়া ও সুগন্ধির ব্যবসা পুনরায় শুরু করেন। এগুলো ছিল সেই একই ব্যবসা যা মক্কার লোকেরা জোর করে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ থেকে কেড়ে নিয়েছিল।
ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গঠন
অবশেষে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ব্যবসা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে তাঁর বিশাল কাফেলা মদীনা থেকে ইয়েমেন ও সিরিয়ায় যাতায়াত করতে শুরু করে। অবশেষে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ইহুদিদের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী আবূ রাফের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত হন।
ব্যবসায়িক কৌশলের পার্থক্য
এই ইহুদি ব্যবসায়ী ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ব্যবসা পরিচালনার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন:
ইহুদি ব্যবসায়ীদের পদ্ধতি:
- নিজেদের মধ্যে সস্তায় এবং অন্যদের কাছে চড়া দামে পণ্য বিক্রি করত
- ব্যবসার সময় সর্বদা মিথ্যা বলত এবং খারাপ পণ্যও চড়া দামে বিক্রি করত, যার কারণে লোকেরা তাদের কাফেলাগুলোকে বিশ্বাস করত না
আব্দুর রহমান ইবনে আউফের পদ্ধতি:
- তাঁর কাফেলায় সবার কাছে একই দামে পণ্য বিক্রি করা হতো
- তিনি আগেই গ্রাহকদের জানিয়ে দিতেন কোন পণ্যে কী কী সমস্যা আছে, যার ফলে লোকেরা আব্দুর রহমান ইবনে আউফের কাফেলাগুলোকে বেশি বিশ্বাস করত
- আব্দুর রহমান ইবনে আউফ তাঁর ব্যবসার জন্য কারো কাছ থেকে ঋণ নিতেন না, প্রতিটি ব্যবসা নিজের অর্থ দিয়ে করতেন, যত ছোটই হোক না কেন, যাকে আজ বুটস্ট্র্যাপিং ব্যবসা বলা হয়
- আব্দুর রহমান ইবনে আউফের কাফেলায় গ্রাহকদের প্রতিটি সমস্যা সেই সময়েই সমাধান করা হতো, যেমনটা আজও Walmart ও Amazon-এর মতো কোম্পানিগুলোতে হয়
চূড়ান্ত সাফল্য
এই কৌশলগুলোর কারণেই অবশেষে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সমস্ত ইহুদিদের পিছনে ফেলে মদীনার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হন। এই সবকিছু দেখে একদিন কেউ আব্দুর রহমান ইবনে আউফকে জিজ্ঞেস করে যে তিনি কীভাবে এত বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। তিনি উত্তর দেন, “আমি কখনো এমন কোনো পাথর তুলিনি যতক্ষণ না আমার এই আশা থাকে যে সেই পাথরের নিচে সোনা থাকবে।”
বলা হয় যে মদীনার একটি বড় অংশ শুধুমাত্র আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ব্যবসা থেকেই চলত। এই ছিল সেই মদীনা যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সবকিছু ছেড়ে খালি হাতে এসেছিলেন, আর আজ তিনি সেই মদীনা থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়েছিলেন।




























