গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূমিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর হাতছানি, সেখানে কর্মরত একজন সাংবাদিকের কলম থেকে ঝরে পড়া শব্দগুলো কেবল সংবাদ নয়, তা হয়ে ওঠে ইতিহাস ও প্রতিরোধের দলিল। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আনাস জামাল আল-শরিফের লেখা একটি চিঠি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা তিনি তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যুর আগে লেখা শেষ উইল বা অন্তিম বার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এই চিঠিটি শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়, এটি গাজায় কর্মরত সাংবাদিকদের ভয়াবহ বাস্তবতা, ফিলিস্তিনি জনগণের আর্তি এবং বিশ্বাসের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। আনাসের এই বার্তাটি তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সাক্ষ্যপত্র হয়ে উঠেছে।
বার্তার পূর্ণ বিবরণ
আনাস আল-শরিফের লেখা সেই মর্মস্পর্শী বার্তাটি নিচে সম্পূর্ণ তুলে ধরা হলো:
যদি এই কথাগুলো আপনাদের কাছে পৌঁছায়, তবে জানবেন, ইসরায়েল আমাকে হত্যা করতে এবং আমার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে সফল হয়েছে। প্রথমে, আপনাদের ওপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
আল্লাহ জানেন, আমি আমার জনগণের জন্য একটি অবলম্বন ও কণ্ঠস্বর হতে আমার সমস্ত প্রচেষ্টা এবং শক্তি দিয়েছি, যখন থেকে আমি জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের অলিগলিতে জীবনের জন্য চোখ খুলেছি। আমার আশা ছিল, আল্লাহ আমার জীবন দীর্ঘায়িত করবেন যাতে আমি আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে আমাদের মূল শহর অধিকৃত আসকালান (আল-মাজদাল)-এ ফিরে যেতে পারি। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছাই প্রথমে এসেছে এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমি ব্যথার সমস্ত খুঁটিনাটি দিক দিয়ে জীবনযাপন করেছি, বহুবার দুর্ভোগ ও হারানোর স্বাদ পেয়েছি, তবুও আমি সত্যকে তার আসল রূপে, কোনো বিকৃতি বা মিথ্যাচার ছাড়াই পৌঁছে দিতে একবারও দ্বিধা করিনি—যাতে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হন যারা নীরব ছিল, যারা আমাদের হত্যাকে মেনে নিয়েছিল, যারা আমাদের শ্বাসরোধ করেছিল এবং যাদের হৃদয় আমাদের শিশু ও নারীদের ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষেও বিচলিত হয়নি, দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের জনগণ যে গণহত্যার শিকার হয়েছে তা বন্ধ করার জন্য কিছুই করেনি।
আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম ফিলিস্তিনকে—মুসলিম বিশ্বের মুকুটের মণি, এই পৃথিবীর প্রত্যেক মুক্ত মানুষের হৃদস্পন্দন। আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম এর জনগণকে, এর নির্যাতিত ও নিষ্পাপ শিশুদের, যারা কখনও স্বপ্ন দেখার বা নিরাপত্তা ও শান্তিতে বাঁচার সুযোগ পায়নি। তাদের পবিত্র দেহগুলো হাজার হাজার টন ইসরায়েলি বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের নিচে পিষ্ট হয়েছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে দেয়ালের গায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, শিকল যেন আপনাদের স্তব্ধ করতে না পারে, সীমানা যেন আপনাদের আটকে রাখতে না পারে। এই ভূমি ও তার জনগণের মুক্তির পথে সেতু হয়ে উঠুন, যতক্ষণ না আমাদের চুরি হয়ে যাওয়া মাতৃভূমিতে মর্যাদা ও স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। আমার পরিবারের যত্ন নেওয়ার ভার আপনাদের ওপর অর্পণ করলাম। আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম আমার প্রিয় কন্যা শামকে, আমার চোখের মণিকে, যাকে আমার স্বপ্নের মতো বড় হতে দেখার সুযোগ আমি পাইনি।
আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম আমার প্রিয় পুত্র সালাহকে, যাকে আমি সমর্থন দিয়ে এবং জীবনের পথে সঙ্গ দিয়ে বড় করতে চেয়েছিলাম, যতক্ষণ না সে আমার বোঝা বহন করার এবং এই দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী হয়।
আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম আমার প্রিয় মাকে, যার আশীর্বাদের দোয়ায় আমি আজ এখানে এসেছি, যার মোনাজাত ছিল আমার দুর্গ এবং যার আলো আমার পথ দেখিয়েছে। আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে শক্তি দেন এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত করেন।
আপনাদের কাছে আমানত রেখে গেলাম আমার জীবনসঙ্গী, আমার প্রিয় স্ত্রী উম্মে সালাহকে (বায়ান), যার কাছ থেকে যুদ্ধ আমাকে বহু দীর্ঘ দিন ও মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তবুও সে আমাদের বন্ধনের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল, জলপাই গাছের কাণ্ডের মতো অবিচল, যা কখনো নত হয় না—ধৈর্যশীল, আল্লাহর ওপর আস্থাশীল এবং আমার অনুপস্থিতিতে সমস্ত শক্তি ও বিশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছে।
আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, তাদের পাশে দাঁড়াবেন, মহান আল্লাহর পর তাদের অবলম্বন হবেন। যদি আমি মারা যাই, আমি আমার নীতির ওপর অবিচল থেকেই মারা যাবো। আমি আল্লাহর সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, তাঁর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে নিশ্চিত এবং এ ব্যাপারে আশ্বস্ত যে, যা আল্লাহর কাছে আছে তা-ই উত্তম ও চিরস্থায়ী।
হে আল্লাহ, আমাকে শহীদদের মাঝে কবুল করুন, আমার অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহ ক্ষমা করুন এবং আমার রক্তকে এমন এক আলোতে পরিণত করুন যা আমার জনগণ ও পরিবারের জন্য স্বাধীনতার পথকে আলোকিত করে। যদি আমার কোনো ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আমার জন্য রহমতের দোয়া করবেন, কারণ আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি এবং কখনো তা পরিবর্তন বা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।
গাজাকে ভুলবেন না… আর ক্ষমা ও কবুলিয়াতের জন্য আপনাদের আন্তরিক দোয়ায় আমাকেও ভুলবেন না।
-আনাস জামাল আল-শরিফ
শেষ পর্যন্ত, আনাস আল-শরিফের এই উইল শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত নথি নয়, এটি ফিলিস্তিনের বর্তমান প্রজন্মের সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অদম্য চেতনার এক ঐতিহাসিক দলিল। তাঁর শেষ অনুরোধটিই যেন হয়ে উঠেছে সমগ্র ফিলিস্তিনি জনগণের সম্মিলিত আকুতি: “গাজাকে ভুলবেন না…“




























